সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত চিকিৎসা দিয়ে প্রাণহানি কমাতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের পাশে ২৪টি ট্রমা সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছিল। দুই দফায় এসব কেন্দ্রের অবকাঠামো তৈরিতে ব্যয় হয়েছে অন্তত ১৪০ কোটি টাকা। কিন্তু প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গেলেও কোনো কেন্দ্রই পূর্ণাঙ্গ ট্রমা সেবা দিতে পারছে না।
কোথাও সীমিত পরিসরে বহির্বিভাগ চলছে, কোথাও ভবন অন্য কাজে ব্যবহার হচ্ছে, আর অধিকাংশই জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে কার্যত অকার্যকর। অথচ একই সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বেড়েছে। আজ বিশ্ব ট্রমা দিবসে তাই বিপুল অর্থে গড়া এই কেন্দ্রগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
পুলিশ ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি ও রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে প্রকৃত প্রাণহানি সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি। অর্থাৎ সংকটের প্রকৃত মাত্রা সরকারি পরিসংখ্যানে পুরোপুরি ধরা পড়ছে না বলে এসব সংগঠনের ধারণা।
গুরুতর আহত ব্যক্তির চিকিৎসায় দেরি হলে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, মাথা ও বুকে আঘাত কিংবা হাড় ভাঙার মতো ক্ষেত্রে দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। মহাসড়কের কাছে ট্রমা সেন্টার থাকলে আহত ব্যক্তিকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা যায়, প্রয়োজনে উন্নত হাসপাতালে পাঠানোও সম্ভব হয়। এই বিবেচনাতেই ২০০৪-০৫ অর্থবছরে প্রথম পর্যায়ে ১০টি ট্রমা সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১০ সালে আরও ১৪টি কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা হয়।
কিন্তু দুই দফায় তৈরি ২৪টি কেন্দ্রের অধিকাংশেই নিয়মিত চিকিৎসাসেবা চালু করা যায়নি। এর মধ্যে মাত্র দুটি কেন্দ্রে সীমিত পরিসরে বহির্বিভাগের সেবা চলছে। আরেকটি কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট জেলা হাসপাতালের অর্থোপেডিকস বিভাগের অংশ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। অর্থাৎ ২৪টির মধ্যে মাত্র তিনটি কোনো না কোনোভাবে কাজে লাগছে, বাকিগুলোর অবস্থা প্রায় অচল।
এই ব্যর্থতার মূল কারণ জনবল ও সরঞ্জামের ঘাটতি। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি কেন্দ্রে সাতজন কনসালট্যান্ট, তিনজন অর্থোপেডিক সার্জন, দুজন অ্যানেসথেসিস্ট ও দুজন আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তাসহ মোট ১৪ জন চিকিৎসক থাকার কথা ছিল। এর সঙ্গে ১০ জন নার্স এবং ফার্মাসিস্ট ও রেডিওগ্রাফারের মতো কারিগরি জনবলও থাকার কথা। কিন্তু প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী নিয়োগ হয়নি। ফলে অধিকাংশ কেন্দ্রে পূর্ণাঙ্গ সেবা শুরু করা যায়নি। অনেক কেন্দ্রে জরুরি রোগী ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও নেই।
কিশোরগঞ্জের ভৈরব ট্রমা সেন্টার এর একটি উদাহরণ। জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাইদুর রহমান জানান, জনবল নিয়োগ না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিতে এখনো পূর্ণাঙ্গ সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। সুনামগঞ্জের ছাতক ট্রমা সেন্টারেরও একই অবস্থা। সেখানকার সিভিল সার্জন ডা. চৌধুরী জালাল উদ্দিন মুর্শেদ বলেন, স্থায়ী জনবল না থাকায় সেবা ব্যাহত হচ্ছে। মাঝেমধ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকেরা গিয়ে কিছু সেবা দেন।
মহাসড়কে চিকিৎসা পেতে দেরির ঝুঁকি কতটা, তার একটি উদাহরণ ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলা। হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত নয় মাসে সেখানে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৮ জনের প্রাণ গেছে, আহত হয়েছেন তিন শতাধিক। উপজেলার সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তানসিভ জুবায়ের নাদিম বলেন, আহতদের দ্রুত চিকিৎসায় ট্রমা সেন্টার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাঙ্গা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগকেন্দ্র, যেখানে প্রাণহানিও বেশি। তাঁর মতে, এখানে একটি ট্রমা সেন্টার হলে আহতরা দ্রুত সেবা পেতেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ভবন তৈরি করলেই চলবে না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, ট্রমা সেন্টারকে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলবে না। তিনি বলেন, জরুরি রোগী ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ এবং গুরুতর রোগীকে উন্নত হাসপাতালে পাঠানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। এ জন্য নিকটবর্তী জেলা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সঙ্গে সমন্বয়ও জরুরি।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বড় সড়ক ও মহাসড়ক তৈরি হলেও সড়কে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি, তাই প্রতিবছর মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, যাত্রীদের স্বাস্থ্য-নিরাপত্তার কথা ভেবেই ট্রমা সেন্টার করা হয়েছিল, কিন্তু অজ্ঞাত কারণে কার্যক্রম শুরু হয়নি। এখন সরকার এগুলো চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে, যা ইতিবাচক বলে তিনি মনে করেন।
সরকারি সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন অকার্যকর থাকা ট্রমা সেন্টারগুলো আধুনিকায়ন করে ‘অ্যাক্সিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট সেন্টার’ নামে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, সরঞ্জাম ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করে পর্যায়ক্রমে সেবা চালু করা হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসনিম বলেন, ইতিমধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং খুব দ্রুতই কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম শুরু হবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু কেন্দ্র নয়, মহাসড়কে প্রতি ১০ কিলোমিটার পরপর অ্যাম্বুলেন্স রাখা হবে, যাতে দুর্ঘটনার পর দ্রুত সেবা দেওয়া যায়। এ ছাড়া নতুন কয়েকটি ট্রমা সেন্টার নির্মাণের কার্যক্রমও প্রক্রিয়াধীন আছে বলে তিনি জানান।
তবে সরকারের এই ঘোষণা কতটা বাস্তবায়িত হবে, সেটি নির্ভর করবে জনবল নিয়োগ ও সরঞ্জাম সরবরাহের গতির ওপর। কেন্দ্রগুলো চালুর নির্দিষ্ট সময়সীমা বা এ জন্য বাড়তি বরাদ্দের পরিমাণ সম্পর্কে এখনো কিছু জানানো হয়নি। দুই দশকের পুরোনো অব্যবহৃত অবকাঠামো নতুন নামে চালু হলেই সমস্যার সমাধান হবে কি না, সে প্রশ্নও থেকে যায়, কারণ আগের ব্যর্থতার মূল কারণ ছিল ভবনের অভাব নয়, জনবল ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি।

