কক্সবাজারের ইনানীতে টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১০ জনে দাঁড়িয়েছে। শনিবার দুপুর দেড়টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া কর্মকর্তা তালহা বিন জসীম এ তথ্য জানান। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন থাকতে পারেন বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এ এম সাজেদুর রহমান। ঘটনায় আহত হয়েছেন নয়জন। আগুনের কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। তদন্তের জন্য কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে।
প্রশাসন ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকালে মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আতিকুর রহমান মজুমদার বিডিনিউজকে জানান, সকাল সাড়ে ৬টার দিকে আগুনের সূত্রপাত। অন্য একটি সংবাদমাধ্যম সময় উল্লেখ করেছে সকাল ৮টা। ফলে আগুন লাগার সঠিক সময় নিয়ে প্রতিবেদনগুলোতে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। কক্সবাজার শহরের প্রবেশদ্বার কলাতলী থেকে রিসোর্টটির দূরত্ব প্রায় ২৯ কিলোমিটার। বাঁশ ও কাঠের তৈরি রিসোর্টটি আগুনে পুরোপুরি পুড়ে যায়।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানান, রিসোর্টটির তিনটি তলাই কাঠের তৈরি ছিল। ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরো স্থাপনা ভস্মীভূত হয়। কাঠামোগত এই ঝুঁকিই ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি বাড়ানোর অন্যতম কারণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিহত ছয়জনের পরিচয় নিয়ে পুলিশ ও প্রশাসনের বক্তব্যে কিছু পার্থক্য আছে। পুলিশ সুপার জানান, পরিবারটির নয়জন সদস্য বেড়াতে এসেছিলেন। এঁদের মধ্যে তিনজন সুস্থ আছেন। তাঁরা দাবি করছেন, বাকি সদস্যরা নিখোঁজ। বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ইত্তেফাকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহত ছয়জন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুল আহাদ সরদারের পরিবারের সদস্য। উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তারও জানিয়েছেন, রিসোর্টে আহাদের পরিবারের নয়জন সদস্য ছিলেন। এঁদের ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে, বাকি তিনজন হাসপাতালে ভর্তি।
ফায়ার সার্ভিসের কাছে নিখোঁজ ছয়জনের নাম আছে বলে জানিয়েছেন মোরশেদ হোসেন। তাঁরা হলেন ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭) এবং চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) ও পাঁচ বছরের ফায়িজান আহম্মেদ। তবে জেলা প্রশাসক আ. মান্নান জানান, নিখোঁজের বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট তথ্য মেলেনি। রিসোর্টে অবস্থানকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। উদ্ধার হওয়া মরদেহের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
ওসি আতিকুর রহমান জানান, রিসোর্টটিতে ২৭ জনের প্রবেশের তথ্য পাওয়া গেছে। এঁদের মধ্যে নয়জন আগুনের সময় রিসোর্টের বাইরে ছিলেন। উদ্ধার অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত হতাহতের পূর্ণাঙ্গ চিত্র দেওয়া সম্ভব নয় বলেও তিনি জানান। ফলে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
আহত নয়জন এখন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি। তাঁরা হলেন সায়ানুল মান্নান (৩৫), তাঁর স্ত্রী ফাহমিদা (৩১), মাসুদ (৩০), তাঁর স্ত্রী মেহেরুন্নেছা (৩০), ডা. শিহাব উদ্দিন সাদি (৩১), ডা. নাফিজা নাওয়ার খান (২৯), আশিক (২৮), আইরিন ও ইমা। আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল জানান, আহতদের মধ্যে পাঁচজন দগ্ধ, তাঁদের শরীরের প্রায় ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে আহতদের মধ্যে দুজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি ও ছাড়া পাওয়াদের সংখ্যা নিয়ে তাই দুই প্রতিবেদনে কিছুটা অমিল দেখা যায়।
ওই পরিবারের সদস্য আশিকুল ইসলাম হাসপাতালে ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি জানান, সকালে তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। তাঁর স্ত্রী আগুন দেখে তাঁকে ডেকে তোলেন। এরপর স্ত্রী পাশের কক্ষে থাকা অন্য স্বজনদের ডাকতে যান। আশিকুল দ্রুত একটি জানালা ভেঙে লাফ দিয়ে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু তাঁর স্ত্রী আর বের হতে পারেননি।
আগুনের কারণ নিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ফায়ার সার্ভিস তদন্ত করছে। কেউ কেউ ধারণা করছেন, রিসোর্টের রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুন লাগার প্রাথমিক ধারণার কথা বলা হয়েছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হচ্ছে। বিডিনিউজের তথ্য অনুযায়ী কমিটিতে চার থেকে পাঁচজন সদস্য থাকবেন, যাঁদের মধ্যে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রতিনিধি থাকবেন। অন্য প্রতিবেদনে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিস্তারিত জানানো হবে।
এ ঘটনায় একটি গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের লোকজন ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে গেছেন। এ অভিযোগ এখনো যাচাই করা যায়নি এবং রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
হতাহতদের সবাই পর্যটক বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক। কাঠের তৈরি তিনতলা স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন ছিল, জরুরি নির্গমনপথ ছিল কি না এবং রিসোর্টটির অনুমোদন ও নিরাপত্তা পরিদর্শনের অবস্থা কী ছিল, এসব প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারে এ ধরনের কাঠের স্থাপনায় নিরাপত্তা-মান নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি কতটা ছিল, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেই এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

