এক বিসিএসে সুপারিশ পেয়ে ক্যাডার হিসেবে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরও আরেকটি বিসিএসে পুলিশি ও গোয়েন্দা যাচাইয়ের পর্যায়ে বাদ পড়েছেন দুই প্রার্থী। ৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফলের গেজেটে তাঁদের নাম না পেয়ে বিস্মিত হয়েছেন তাঁরা। কেন নাম বাদ গেল, প্রকাশিত তথ্যে তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। এই ঘটনায় সরকারি নিয়োগে ভেরিফিকেশন-ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও যৌক্তিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বাদ পড়াদের একজন নুরে আলম। ৪৪তম বিসিএসে আনসার ক্যাডারে সুপারিশ পেয়ে তিনি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে চাকরিতে যোগ দেন। বর্তমানে আনসারের সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত তিনি এখন বেসিক প্রশিক্ষণে আছেন। পুলিশে কাজ করার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন থেকে তিনি ৪৫তম বিসিএসেও অংশ নেন এবং পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। কিন্তু ১৪ অক্টোবর চূড়ান্ত ফলাফলের গেজেট প্রকাশের পর দেখেন, তালিকায় তাঁর নাম নেই।
একই অভিজ্ঞতা নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সহকারী সার্জন মো. ইফতেখারুল ইসলামের। রংপুর মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস শেষ করে তিনি ৪৮তম বিসিএসে (বিশেষ) স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুপারিশ পান এবং এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে যোগ দেন। অথচ ৪৫তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও তিনি গেজেটে বাদ পড়েছেন।
দুজনের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে বিভিন্ন ধাপে যাচাই-বাছাই হলেও তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো নেতিবাচক তথ্য পাওয়ার কথা তাঁদের জানানো হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, ভেরিফিকেশনের কারণেই তাঁরা বাদ পড়েছেন, যদিও সরকারিভাবে এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
৪৫তম বিসিএসে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) ১ হাজার ৮০৭ জনকে সুপারিশ করেছিল। কিন্তু নিয়োগের প্রজ্ঞাপন হয়েছে ১ হাজার ৭০২ জনের। অর্থাৎ ১০৫ জন নিয়োগ পাননি অথবা প্রক্রিয়ায় অংশ নেননি। এঁদের মধ্যে অনেকে ভেরিফিকেশনে বাদ পড়েছেন বলে জানা গেছে।
সরকারি চাকরিতে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে যাচাইয়ের চর্চা পুরোনো। পুলিশি যাচাইয়ে নির্ধারিত ফরমে দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়। এর মধ্যে আছে ফৌজদারি, রাজনৈতিক বা অন্য কোনো মামলায় গ্রেপ্তার, অভিযুক্ত বা দণ্ডিত হওয়ার ইতিহাস এবং নজরবন্দী বা বহিষ্কারের পূর্ণ বিবরণ। এর বাইরে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতেও অনেকে বাদ পড়েন।
এর আগেও এমন অভিযোগ উঠেছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে চূড়ান্ত সুপারিশ করা হলেও প্রথম ধাপেই ২ হাজার ৭০০ জনের বেশি প্রার্থীকে ভেরিফিকেশনে বাদ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সমালোচনার মুখে তাঁদের প্রায় সবাইকে নিয়োগ দেওয়া হয়। গত সেপ্টেম্বরে ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে (শিক্ষা) চূড়ান্ত ফলে উত্তীর্ণ হয়েও প্রজ্ঞাপন থেকে ৪৬ জনের নাম বাদ পড়ে। সমালোচনার মুখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বাদ পড়া ৪৬ জনের প্রজ্ঞাপন হবে। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কারও প্রতি বৈষম্য করা হবে না, তবে নিয়োগের আগে পুলিশি যাচাই একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া।
এক বিসিএসে চাকরিতে বহাল থেকে অন্যটিতে ভেরিফিকেশনে বাদ পড়ার বিষয়ে জানতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দুজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল, কিন্তু আনুষ্ঠানিক বক্তব্য মেলেনি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, এমন হতে পারে, কারণ প্রতিবেদন দেয় পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থা, মন্ত্রণালয় নয়। তাঁর ভাষ্য, কেউ আপিল করলে আবার পুনঃযাচাই হয়। প্রয়োজনে দ্বিতীয় বা তৃতীয় কোনো সংস্থার মাধ্যমেও যাচাই করা হয়। কারণ মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়, ভুল হতেই পারে।
ক্ষোভ ও হতাশা লুকাননি বাদ পড়া দুই প্রার্থী। নুরে আলম বলেন, তাঁর পুরো ক্যারিয়ার এলোমেলো হয়ে গেছে। পুলিশে সুপারিশ পাওয়ার পর আনসার ক্যাডারের প্রশিক্ষণও ঠিকমতো নিতে পারেননি, আর এখন পুলিশে যাওয়ার সুযোগও থাকল না। তাঁর প্রশ্ন, বিরুদ্ধে নেতিবাচক কিছু থাকলে তিনি আনসারে চাকরি করছেন কীভাবে। ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, চার বছরের লালিত স্বপ্ন এক রাতের ব্যবধানে ধূলিসাৎ হওয়া মেনে নেওয়ার মতো নয়। কেন চূড়ান্ত ফলাফলে উত্তীর্ণ হয়েও বাদ পড়লেন, তা তিনি জানেন না।
ভেরিফিকেশন-ব্যবস্থার কড়া সমালোচনা করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তাঁর মতে, এসব ঘটনা ভেরিফিকেশন যে একেবারেই অপ্রয়োজনীয়, তার সুস্পষ্ট প্রমাণ। তাঁর অভিযোগ, এটি সম্পূর্ণ দলীয় বিবেচনায় করা হয় এবং পুরোপুরি বৈষম্যমূলক। ভেরিফিকেশন অযথা হয়রানি ও আর্থিক লেনদেনের সুযোগও তৈরি করে, ফলে পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তিনি মনে করেন, আমলাতন্ত্রে ব্যাপক দলীয়করণের জন্যও এই ব্যবস্থা দায়ী। তাঁর বক্তব্য, মেধার ভিত্তিতে যাঁরা উত্তীর্ণ হবেন, তাঁদেরই চূড়ান্ত নিয়োগ দিতে হবে।
এই ঘটনার একটি বিশেষ দিক হলো স্ববিরোধিতা। একই ব্যক্তি এক নিয়োগপ্রক্রিয়ায় যাচাইয়ে উত্তীর্ণ হয়ে ক্যাডার হিসেবে কাজ করছেন, আবার অন্যটিতে একই ধরনের যাচাইয়ে অনুপযুক্ত বিবেচিত হচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে। তবে বাদ পড়ার প্রকৃত কারণ প্রকাশ না হওয়ায় নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। সম্ভবত দুই যাচাইয়ের সময়, সংস্থা বা প্রতিবেদনের ভিন্নতা এর পেছনে থাকতে পারে, তবে এটি অনুমানমাত্র। বাদ পড়াদের আপিলের সুযোগ আছে কি না এবং পুনঃযাচাইয়ে কত সময় লাগবে, সে বিষয়েও সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

