জাপানের অর্থায়নে নির্মাণাধীন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে একটি বিস্তৃত শিল্প ভ্যালু চেইন গড়ে তুলতে চায় টোকিও। এর মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যকে বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরের আগে টোকিওর কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু। সফর শুরু হওয়ার কথা ২৬ অক্টোবর।
দ্য হিন্দুকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি জ্যেষ্ঠ কূটনৈতিক সূত্র বলেছে, মাতারবাড়ী বন্দর বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক শিল্প কেন্দ্রে রূপ দিতে পারে। একই সঙ্গে এটি আঞ্চলিক সংযুক্তিও বাড়াবে। জাপানি কূটনীতিকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বন্দরটি এমন একটি শিল্প ভ্যালু চেইনের অংশ হবে, যা বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে জুড়ে দেবে।
এই পরিকল্পনার নজির হিসেবে জাপানি কর্মকর্তারা থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া-ভিয়েতনাম উন্নয়ন করিডোরের কথা তুলে ধরেছেন। জাপানের অর্থায়ন ও অবকাঠামোগত পরিকল্পনায় বাস্তবায়িত ওই প্রকল্প ব্যাংককের সঙ্গে কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের যোগাযোগ গড়ে তুলেছে। লিখিত জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, এ ক্ষেত্রে ব্যাংকক অনুসরণযোগ্য মডেল হতে পারে। তাঁর ভাষ্য, নিজস্ব বন্দর ও সাউদার্ন ইকোনমিক করিডোরের মাধ্যমে শহরটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতৃত্ব দিয়েছে। জাপান চায় ভুটান, নেপাল, মিয়ানমার, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যোগাযোগ জোরদার করতে মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে একই ধরনের মডেল দাঁড় করাতে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরে মাতারবাড়ী যে বিশেষ গুরুত্ব পাবে, তার ইঙ্গিত স্পষ্ট। ২০২৬ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে বন্দর, শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রসহ বেশ কয়েকটি প্রকল্পের জন্য টোকিওর কাছে আর্থিক সহায়তা চাইতে পারেন তিনি। সফরের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আগস্টে তিনি মাতারবাড়ী পরিদর্শন করেন। সেখানে তাঁকে প্রকল্পের পরবর্তী ধাপের কাজ ও প্রয়োজন সম্পর্কে অবহিত করা হয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগে জানিয়েছিল, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সফরের আলোচ্যসূচিতে থাকবে মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন উদ্যোগ বা এমএমআইডিআই। এই সফরে বাংলাদেশ জাপানের কাছে ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ইয়েন, অর্থাৎ প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি কৌশলগত বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্যাকেজের প্রস্তাব দেবে।
এর মধ্যে এমএমআইডিআই ও মাতারবাড়ী হাবের জন্য ৫০০ বিলিয়ন ইয়েন বা ৩ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের প্রস্তাব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এই অর্থ ব্যয় হবে গভীর সমুদ্রবন্দর ও লজিস্টিকস, সড়ক ও রেল যোগাযোগ, শিল্প অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে। অর্থাৎ শুধু একটি বন্দর নয়, বন্দরকে ঘিরে পুরো শিল্প ও পরিবহন কাঠামো গড়ে তোলার ভাবনা এখানে কাজ করছে।
মাতারবাড়ী নির্মাণ শেষ হলে এটিই হবে বাংলাদেশের একমাত্র গভীর সমুদ্রবন্দর। বর্তমানে বড় জাহাজ ভেড়াতে দেশকে সিঙ্গাপুর, কলম্বো ও মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বন্দরের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে সরাসরি বড় জাহাজ ভিড়তে পারলে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক ট্রানজিট ও শিল্পায়নের নতুন সুযোগও তৈরি হতে পারে।
জাইকার অর্থায়নে নির্মাণাধীন এই বন্দরের বড় অংশের কাজ হয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে। তখন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক তুলনামূলক মসৃণ থাকায় সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ ছিল। সে সময়ই ফেনী নদীর ওপর ত্রিপুরার সঙ্গে যুক্ত মৈত্রী সেতু নির্মিত হয়। এর ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ী বন্দরের সরাসরি যোগাযোগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দেওয়ায় সেতুটি এখনো অব্যবহৃত পড়ে আছে।
এই বাস্তবতা পরিকল্পনার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াতে পারে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে যুক্ত করার যে কল্পনা জাপান করছে, তা বাস্তবে রূপ নিতে হলে ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্কের উন্নতি অপরিহার্য। অব্যবহৃত মৈত্রী সেতু এর প্রত্যক্ষ উদাহরণ, যেখানে অবকাঠামো তৈরি হলেও রাজনৈতিক সমঝোতার অভাবে তার সুফল মেলেনি।
তবে এ নিয়ে জাপানি কর্মকর্তারা আশাবাদী। তাঁরা বলেন, ভারত-বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি ইতিবাচক। তাঁদের মতে, বাংলাদেশ থেকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ালে বন্দরের উপযোগিতা ও গুরুত্ব আরও বাড়বে।
সব মিলিয়ে মাতারবাড়ী এখন কেবল একটি দেশের বন্দর প্রকল্পে সীমিত থাকছে না, বরং আঞ্চলিক কূটনীতির কেন্দ্রে চলে আসছে। প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে প্রস্তাবিত অর্থায়ন প্যাকেজ কতটা এগোয় এবং ভারতের সঙ্গে সংযোগ নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি হয় কি না, সেদিকেই এখন নজর থাকবে।

