রাজধানীর আবদুল গনি রোডের বর্তমান সচিবালয় সরিয়ে শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে নতুন সচিবালয় গড়ার চূড়ান্ত প্রস্তাব আজ রোববার মন্ত্রিসভার বৈঠকে উঠছে। সরকার আগেই এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন সচিবালয়ে থাকবে প্রায় ৩০ লাখ বর্গফুট জায়গা, যেখানে সরকারের সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ একসঙ্গে বসতে পারবে। প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত অন্তত দুজন কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী নিজের বর্তমান মেয়াদের মধ্যেই নতুন সচিবালয়ে অফিস স্থানান্তর করতে চান।
বিকেল সাড়ে ৪টায় বর্তমান সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার সাপ্তাহিক বৈঠক হওয়ার কথা। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দায়িত্বশীল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকেই স্থানান্তরের চূড়ান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে।
সরকারের মোট ৫৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে বর্তমানে ৩৮টি রয়েছে সচিবালয় প্রাঙ্গণে। এসব দপ্তরের প্রশাসনিক কাজ চলছে মাত্র ১৮ লাখ বর্গফুট জায়গার মধ্যে। অর্থাৎ বাকি ১৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ আলাদা স্থানে বসছে। নতুন সচিবালয় হলে ১৮ লাখের জায়গায় ৩০ লাখ বর্গফুট পাওয়া যাবে, যা বর্তমানের তুলনায় প্রায় দেড় গুণেরও বেশি। এতে সব দপ্তর এক ছাদের নিচে আনার সুযোগ তৈরি হবে। সমন্বয় সহজ হবে, ফাইল চলাচলে সময়ও কমতে পারে।
বর্তমান সচিবালয়ের অবস্থাও স্থানান্তরের আলোচনাকে জোরালো করেছে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের শীর্ষপর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সচিবালয়ে ১২টি প্রধান ভবন আছে। এর মধ্যে ৮টির অবস্থা বেশ নাজুক। বেশির ভাগই ১৯৬০-এর দশকে নির্মিত। তাঁর ভাষ্য, জরাজীর্ণ ভবন ভেঙে নতুন করে নির্মাণের প্রসঙ্গ ওঠার পর থেকেই সার্বিকভাবে সচিবালয় স্থানান্তরের আলোচনা গতি পায়।
গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের গত মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, সচিবালয়ের ভেতরে দাপ্তরিক কাজের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই। পার্কিংয়ের তীব্র সংকটও রয়েছে। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় স্থানান্তরের আলোচনা এগোচ্ছে বলে তিনি জানান। তবে তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে মন্ত্রিসভা থেকেই।
স্থানান্তরের ভাবনা নতুন নয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার একাধিকবার সচিবালয় সরানোর কথা ভাবলেও তা বাস্তবে রূপ পায়নি। উল্টো তারা বর্তমান সচিবালয়ের ভেতরের ফাঁকা জায়গায় দুটি ২০ তলা ভবন নির্মাণ করে। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত এপ্রিলে সচিবালয়ের ভেতরে আরও একটি ২১ তলা ভবন নির্মাণের প্রস্তাব জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে বা একনেকে ওঠে। প্রধানমন্ত্রী সেটি অনুমোদন না দিয়ে শেরেবাংলা নগরে নতুন সচিবালয় স্থাপনের পরিকল্পনা করতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং স্থাপত্য অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেন।
সেই নির্দেশের ধারাবাহিকতায় স্থাপত্য অধিদপ্তর গত ৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্থানান্তরের একটি খসড়া পরিকল্পনা উপস্থাপন করে। ওই বৈঠকেই বিস্তারিত ও চূড়ান্ত পরিকল্পনা মন্ত্রিসভার বৈঠকে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। অর্থাৎ নতুন ভবন না করে পুরো সচিবালয় সরানোর পথেই হাঁটছে বর্তমান সরকার।
প্রস্তাবিত নকশায় প্রখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের স্থাপত্য ঐতিহ্য বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। সেখানে ১২ থেকে ১৪ তলাবিশিষ্ট মোট বারোটি ভবন নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় সাড়ে তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকা। নতুন সচিবালয়ের চারপাশে থাকবে চক্রাকার সড়ক। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় মসজিদ, জিমনেসিয়াম, নান্দনিক ফোয়ারা, বড় পরিসরের পার্কিং এবং কেন্দ্রীয় কনভেনশন সেন্টারসহ আধুনিক প্রশাসনিক সুবিধা রাখার পরিকল্পনা আছে।
কর্মপরিবেশেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে। পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত আরেক কর্মকর্তা জানান, এখনকার মতো প্রত্যেক কর্মকর্তার জন্য আলাদা কক্ষ থাকবে না। শুধু শীর্ষ দুই স্তরের কর্মকর্তার জন্য নির্দিষ্ট কক্ষ রাখা হতে পারে। বাকিদের জন্য করপোরেট অফিসের আদলে উন্মুক্ত ফ্লোরে কাচ বা বোর্ডের পার্টিশন থাকবে। তাঁর মতে, এতে কম জায়গায় অনেক বেশি কর্মকর্তা স্বচ্ছন্দে কাজ করতে পারবেন। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে সরকারি দপ্তরের চিরাচরিত কাঠামোয় এটি হবে উল্লেখযোগ্য বদল।
তবে প্রকল্পটি নিয়ে বিরোধিতাও শুরু হয়েছে। প্রস্তাবিত জায়গা নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন শেষে তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘গবেষণা মাঠ পুনরুদ্ধার স্টিয়ারিং কমিটি’র আহ্বায়ক অধ্যাপক এম সালাউদ্দিন এম চৌধুরী বলেন, মাঠের সবুজায়ন, গাছপালা ও জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ন রেখে সেখানে উচ্চতর কৃষি গবেষণা চালাতে চান তাঁরা। তাঁর ভাষ্য, তাঁদের লক্ষ্য শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ রক্ষা নয়, ঢাকার ফুসফুস রক্ষাও।
বিরোধিতার বিষয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর গতকাল রাতে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়টি সরকারের জানা আছে। তাঁদের জন্য এর চেয়ে বড় বা উপযুক্ত জায়গা বরাদ্দের বিষয় সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এটি বড় কোনো সংকট তৈরি করবে না।
এই প্রকল্প ঘিরে দুটি প্রশ্ন সামনে আসছে। প্রথমত, রাজধানীর সীমিত সবুজ এলাকা ও গবেষণা মাঠ কতটা রক্ষা করা যাবে। দ্বিতীয়ত, সাড়ে তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকার ব্যয় এবং স্থানান্তরের দীর্ঘ প্রক্রিয়া প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান মেয়াদের মধ্যে শেষ করা বাস্তবে কতটা সম্ভব। বিকল্প জায়গা বরাদ্দের আশ্বাস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কতটা সন্তুষ্ট করতে পারে, সেটিও দেখার বিষয়।
আজকের মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রস্তাব অনুমোদিত হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে বড় ধাপ পেরোনো হবে। সে ক্ষেত্রে পরবর্তী নজর থাকবে প্রকল্পের নকশা চূড়ান্তকরণ, অর্থ বরাদ্দ এবং জমি নিয়ে ওঠা আপত্তি নিষ্পত্তির দিকে।

