ঠাকুরগাঁওয়ের ভূল্লী উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নে দুর্গাপূজাকে ঘিরে এক ব্যতিক্রমী শোভাযাত্রা আয়োজন করা হয়েছে। বাঁশ ও কাপড়ে তৈরি বিশাল আকৃতির শঙ্খিনী, গুইসাপ, গন্ধগোকুল, ভোঁদড়, কুমিরসহ নানা বন্যপ্রাণীর পুতুল নিয়ে বের হয়েছে এই মিছিল। অন্ধকারে পুতুলগুলোর ভেতরে আলো জ্বলে উঠলে তৈরি হয় ভিন্ন এক দৃশ্য। আয়োজকদের লক্ষ্য, এর মধ্য দিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বন্যপ্রাণীর ভূমিকা এবং সেগুলো সংরক্ষণে মানুষের দায়িত্ব নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় শুরু হওয়া পাঁচ দিনের এই আয়োজন চলবে মঙ্গলবার পর্যন্ত। গ্রামীণ লোকজ শিল্প ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে সমসাময়িক শিল্পীদের সংযোগ তৈরিতে কাজ করে গিদরী বাউলি ফাউন্ডেশন অব আর্টস। সংগঠনটিই এই আয়োজনের উদ্যোক্তা।
গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় সোনাপাতিলা কামারপাড়া গ্রাম থেকে শোভাযাত্রাটি শুরু হয়। এতে একজন শিক্ষার্থী দেবী দুর্গার সাজে অংশ নেন। অন্যরা সেজেছিলেন বিভিন্ন দেবদেবীর বেশে। সঙ্গে ছিল কীর্তনশিল্পীদের একটি দল। মিছিলের পেছনে ছিল বন্যপ্রাণীর পুতুলগুলো। সেখানে শঙ্খিনী, গুইসাপ, বেজি, গন্ধগোকুল, ভোঁদড়, কাঠবিড়ালি, কুমির, মদনটাক, প্রজাপতি, ফড়িং ও মাছের প্রতিকৃতি দেখা গেছে।
গ্রামের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে শোভাযাত্রাটি শেষ হয় সোনাপাতিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে, একটি পূজামণ্ডপের কাছে। সেখানে প্রাণীর মডেলগুলো কয়েকবার বিদ্যালয়ের মাঠ প্রদক্ষিণ করে। এরপর প্রায় এক ঘণ্টা চলে প্রদর্শনী। আয়োজকেরা বলছেন, মানুষের আশপাশ থেকে হারিয়ে যেতে বসা প্রাণীগুলোকে মডেলের মাধ্যমে নতুন করে সামনে আনা হয়েছে। প্রদর্শনীর সময় দর্শনার্থীদের কাছে পরিচিত ও বিপন্ন, দুই ধরনের বন্যপ্রাণী রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
আয়োজকদের একজন ফিরোজ আল সাবা প্রাণীগুলোর পরিবেশগত ভূমিকা ব্যাখ্যা করেন। তাঁর ভাষ্য, শঙ্খিনী বিষধর সাপসহ অন্য সাপ খেয়ে সাপের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। গন্ধগোকুল ফল, পোকামাকড় ও ছোট প্রাণী খায়, ফলে ফসলের ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণে থাকে। পরাগায়ণে প্রজাপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ফড়িং মশাসহ নানা ক্ষুদ্র পোকামাকড় খেয়ে তাদের সংখ্যা সীমিত রাখে।
মদনটাকের বিষয়েও তথ্য দেন আয়োজকেরা। এটি বড় আকারের সারসজাতীয় পাখি, যার মাথা ও গলা পালকহীন এবং গলায় থলির মতো গঠন রয়েছে। জলাভূমি ও নদীতীরের এই পাখি মাছ, ব্যাঙ, সাপসহ ছোট জলজ প্রাণী খেয়ে খাদ্যশৃঙ্খলের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ পুতুলের প্রতিটি প্রাণীই প্রকৃতির একেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্রের প্রতিনিধি।
পুতুল তৈরিতে স্থানীয়দের অংশগ্রহণও ছিল চোখে পড়ার মতো। গ্রামের বাসিন্দা রাধা রাণী জানান, গ্রামের মানুষ নিজেদের বাঁশঝাড়ের বাঁশ দিয়ে প্রাণীগুলোর মডেল বানিয়েছেন। এ কাজে সবাই সহযোগিতা করেছেন। ফলে উপকরণ ও শ্রম, দুই দিক থেকেই আয়োজনটি হয়ে উঠেছে গ্রামের নিজস্ব উদ্যোগ।
স্থানীয় একটি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অমল রায় বলেন, মডেলগুলো এবং পরিবেশ রক্ষায় প্রাণীগুলোর ভূমিকার ব্যাখ্যা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের গুরুত্ব বুঝতে সহায়তা করেছে। একই সঙ্গে প্রদর্শনী দুর্গাপূজার আনন্দও বাড়িয়েছে বলে তাঁর মত। স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠক শহীদ জাকিরুল হক চৌধুরী বলেন, হারিয়ে যেতে বসা বন্যপ্রাণীর মডেলগুলো তাঁকে মুগ্ধ করেছে। তাঁর মতে, এমন উদ্যোগ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে পারলে সবাই উপকৃত হবেন। সব শ্রেণি-পেশার মানুষ পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্ব বুঝে প্রকৃতি রক্ষায় এগিয়ে এলেই এমন উদ্যোগ সফল হবে।
ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক শিক্ষক মাজেদ জাহাঙ্গীর বলেন, কোনো প্রাণী বা দেশীয় প্রজাতি বিলুপ্ত হলে জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। তাঁর ভাষ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য, পরিবেশের সুস্থতা ও মানুষের স্বাস্থ্য ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। প্রাণীর যথাযথ যত্ন নেওয়া এবং তাদের আবাসস্থল রক্ষা করা না গেলে মানুষের কল্যাণও নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
গিদরী বাউলি ফাউন্ডেশন অব আর্টসের সভাপতি কামরুজ্জামান স্বাধীন জানান, পরিবেশগত নানা কারণে অনেক প্রাণী মানুষের আশপাশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় গল্প ও লোকজ জ্ঞানের ভিত্তিতে মডেলগুলো বানানো হয়েছে। এতে প্রাণীগুলোর হারিয়ে যাওয়া নিয়ে স্থানীয় মানুষের উদ্বেগ ও ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে। তাঁর কথায়, এই আয়োজনের মাধ্যমে প্রকৃতির সঙ্গে প্রাণীর সম্পর্কের বিষয়টি মানুষকে নতুন করে মনে করিয়ে দিতে চান তাঁরা।
এই উদ্যোগের বিশেষত্ব হলো, ধর্মীয় উৎসবের আবহে একটি সামাজিক ও পরিবেশগত বার্তা পৌঁছে দেওয়া। উৎসবের ভিড় ও আনন্দের মধ্যে মানুষ সহজেই এমন প্রদর্শনীর দিকে আকৃষ্ট হয়, ফলে বার্তাটি বিদ্যালয়পড়ুয়া শিশু থেকে প্রবীণ পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সীর কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়। স্থানীয় বাঁশ ও কাপড়ের মতো সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহারের কারণে খরচও তুলনামূলক কম, যা অন্য এলাকার জন্যও অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত হতে পারে।
তবে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে শোভাযাত্রার পরের কাজের ওপর। সচেতনতার বার্তা কতটা আচরণে প্রতিফলিত হয় এবং এসব প্রাণীর আবাসস্থল রক্ষায় স্থানীয়ভাবে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। আয়োজনটি মঙ্গলবার পর্যন্ত চলবে, ফলে বাকি দিনগুলোতেও আরও মানুষ এই প্রদর্শনী দেখার সুযোগ পাবেন।

