সেনাসদস্যদের জীবনযাত্রার মান আরও উন্নত করতে ‘ওয়ান র্যাংক ওয়ান পেনশন’ চালুর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ রোববার সকালে সাভার সেনানিবাসে ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড প্রদান অনুষ্ঠান ২০২৬-এ বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ কথা বলেন।
একই বক্তব্যে তিনি জানান, জাতীয় পে-স্কেলে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বেতন ও ভাতা ১০০ থেকে ১৩৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন এবং দেশেই অস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদনের জন্য দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নিজের পারিবারিক প্রেক্ষাপটের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সেনা পরিবারের সদস্য হিসেবে তিনি সেনা পরিবেশেই বেড়ে উঠেছেন। তাই এ ধরনের পরিবেশ তাঁর কাছে নতুন নয়, যদিও আজ তিনি ভিন্ন পরিচয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন।
পেশাগত সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে এবার ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড বা জাতীয় পতাকা পেয়েছে সেনাবাহিনীর কয়েকটি ইউনিট। এগুলো হলো ৭ ও ৩২ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি, ২৫ এয়ার ডিফেন্স রেজিমেন্ট, ৯ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন, ৫৬ ও ৫৭ ইস্ট বেঙ্গল এবং প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট। প্রধানমন্ত্রী এসব ইউনিটের সদস্যদের অভিনন্দন জানান।
ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ডের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, এটি শুধু একটি পতাকা নয়। এটি একটি ইউনিটের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা, আত্মত্যাগ, পেশাদারিত্ব ও দেশের প্রতি অঙ্গীকারের প্রতীক। তাঁর ভাষ্য, জাতীয় পতাকা অর্জনের অর্থ হলো অর্পিত দায়িত্ব আরও নিষ্ঠার সঙ্গে পালনের নতুন শপথ নেওয়া। পতাকার মর্যাদা রক্ষা করা প্রতিটি সৈনিকের পবিত্র দায়িত্ব বলেও তিনি মনে করিয়ে দেন।
সেনাসদস্যদের কল্যাণ নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার তাঁদের কল্যাণ, আবাসন, চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, ক্যারিয়ার উন্নয়ন এবং অবসর-পরবর্তী সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এরই অংশ হিসেবে পে-স্কেলে বেতন-ভাতা বাড়ানো হয়েছে। আর ‘ওয়ান র্যাংক ওয়ান পেনশন’ বাস্তবায়নের বিষয়টি এখন প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।
এই ব্যবস্থার মূল ধারণা হলো, একই পদমর্যাদায় অবসরে যাওয়া সদস্যরা একই হারে পেনশন পাবেন, অবসরের সময়কাল যা-ই হোক না কেন। তবে প্রধানমন্ত্রী কবে নাগাদ এটি কার্যকর হবে বা এর বিস্তারিত কাঠামো কেমন হবে, সে বিষয়ে কোনো সময়সীমা বা তথ্য জানাননি।
বদলে যাওয়া বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রসঙ্গও তিনি তোলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের নিরাপত্তা পরিবেশ দ্রুত পাল্টাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে যুদ্ধের ধরন ও কৌশলও। স্থল, সমুদ্র ও আকাশের পাশাপাশি সাইবার স্পেস, মহাকাশ, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ও তথ্যভিত্তিক সক্ষমতা এখন জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই বাস্তবতায় সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে বলে তিনি জানান।
প্রতিরক্ষা শিল্প প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার সর্বক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অস্ত্র, গোলাবারুদ ও প্রতিরক্ষা সামগ্রী দেশেই তৈরির জন্য দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন, প্রযুক্তি কখনোই মানুষের বিকল্প নয়। তাঁর মতে, এমন একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী প্রয়োজনের মুহূর্তে একযোগে কাজ করতে পারে।
সশস্ত্র বাহিনীর বহুমুখী ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাহিনী শুধু দেশের প্রতিরক্ষার দায়িত্বই পালন করে না। দুর্যোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড ও অন্যান্য জাতীয় জরুরি পরিস্থিতিতেও তারা ভূমিকা রাখে। বিদেশে শান্তিরক্ষা মিশনেও তারা সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যে মূলত তিনটি বার্তা উঠে এসেছে। প্রথমত, বেতন-ভাতা বৃদ্ধির পর এবার পেনশন কাঠামোয় পরিবর্তন আনার দিকে সরকার এগোচ্ছে। দ্বিতীয়ত, আধুনিক যুদ্ধের চরিত্র বিবেচনায় সাইবার, ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো খাতে সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। তৃতীয়ত, দেশীয়ভাবে প্রতিরক্ষা সামগ্রী উৎপাদনের মাধ্যমে বিদেশনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।
তবে ‘ওয়ান র্যাংক ওয়ান পেনশন’ ও দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের মতো উদ্যোগে বড় অঙ্কের অর্থ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন হয়। তাই এসব ঘোষণা বাস্তবে কত দ্রুত ও কীভাবে কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। সংশ্লিষ্ট মহলের নজর থাকবে পেনশন কাঠামোর চূড়ান্ত রূপ এবং এ জন্য বাজেটে কী বরাদ্দ রাখা হয়, তার দিকে।

