ঢাকার আশুলিয়ায় তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান শারমিন গ্রুপের আটতলা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে সিনিয়র মার্চেন্ডাইজার জামাল উদ্দিনের (৩৯) মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হয়েছে। আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে করা এই মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইসমাইল হোসেনকে। তাঁর ছেলে ও পরিচালক শারাফ হোসেনসহ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরাও আসামির তালিকায় আছেন। কারখানা কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বললেও নিহতের পরিবার একে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করছে।
গত বুধবার, ১৪ অক্টোবর সকালে নরসিংহপুর এলাকার কারখানাভবনের ওপর থেকে পড়ে জামালের মৃত্যু হয়। তিনি গাজীপুর সদর থানার বুরুলিয়া ডুয়েট এলাকার মৃত সেকেন্দার আলীর ছেলে। শারমিন গ্রুপের ডিভিশন-৩-এ সিনিয়র মার্চেন্ডাইজার হিসেবে কাজ করতেন।
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, নিহতের বড় ভাই ইস্কান্দার আলী বাদী হয়ে মামলাটি করেছেন। পুরো ঘটনা তদন্ত করে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
মামলার প্রক্রিয়া নিয়ে বাদীর অভিযোগও রয়েছে। ইস্কান্দার আলী বলেন, পরিবার প্রথমে হত্যা মামলা করতে চেয়েছিল। কিন্তু পুলিশ অপমৃত্যুর মামলা ছাড়া অন্য অভিযোগ নিতে অনীহা দেখায়। পরে রাতে থানার সামনে অবস্থান নেওয়া এবং গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রচারিত হওয়ার পর প্ররোচনার মামলা নথিভুক্ত হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে এ অভিযোগের বিষয়ে কোনো বক্তব্য জানা যায়নি।
বিভিন্ন সূত্রের বরাতে ইস্কান্দার আলী আরও অভিযোগ করেন, ঘটনার দিন সকালে কর্মস্থলে জামালকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছিল। সবার সামনে তাঁকে কান ধরে ওঠবস করানো হয়েছে বলেও তাঁর দাবি, যা জামালকে চরম মানসিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়। এসব অভিযোগ এখনো প্রমাণিত নয়, তদন্তে যাচাই হওয়ার কথা।
পারিবারিক সূত্র বলছে, ঘটনার আগের দিন থেকেই কারখানার অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয় নিয়ে উদ্বেগে ছিলেন জামাল। তাঁর স্ত্রী সাবিকুন নাহার জানান, মঙ্গলবার রাতে ফোনে কথা বলার সময় জামাল তাঁকে বলেছিলেন, অফিসে ঝামেলা চলছে এবং তাঁকে কোনো বিষয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়া হতে পারে। বুধবার সকালে অফিসে পৌঁছেও তিনি স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। এর আধা ঘণ্টা পর থেকে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাঁর ফোনে সংযোগ পাওয়া যায়নি।
প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর কারখানার একজন অজ্ঞাত ব্যক্তি ফোন ধরে জানান, জামাল অসুস্থ। তিনি পরিবারকে আশুলিয়ার নারী ও শিশু হাসপাতালে যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে স্বজনেরা জামালের নিথর দেহ দেখতে পান।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বুধবার সকাল আটটায় কর্মস্থলে ঢোকার মাত্র দেড় ঘণ্টার মধ্যে, সাড়ে নয়টার দিকে পরিবারের কাছে তাঁর ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যুর খবর আসে। এজাহারের অভিযোগ, আসামিদের দুর্ব্যবহার, অবমাননা ও মানসিক নির্যাতনের কারণে জামাল আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
ঘটনার সময়রেখায় কিছু প্রশ্ন সামনে আসছে। কর্মস্থলে ঢোকার দেড় ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু, স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার আধা ঘণ্টা পর ফোন বন্ধ হওয়া এবং পরিবারকে সরাসরি না জানিয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তির মাধ্যমে খবর দেওয়া, এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্ব পাবে। কারখানার সিসিটিভি ফুটেজ, সহকর্মীদের বক্তব্য ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন থেকে স্পষ্ট হবে ঘটনার সকালে আসলে কী ঘটেছিল। কর্মস্থলে মানসিক চাপ ও অবমাননার অভিযোগ উঠলে তা শ্রম আইন ও কর্মপরিবেশের প্রশ্নও সামনে আনে।
মামলাটি যেহেতু আত্মহত্যায় প্ররোচনার, তাই তদন্তে প্রমাণ করতে হবে জামালকে সত্যিই এমন পরিস্থিতিতে ফেলা হয়েছিল কি না। অন্যদিকে পরিবার হত্যার সন্দেহ থেকে সরে আসেনি। তদন্তে এ সন্দেহের পক্ষে বা বিপক্ষে তথ্য মিললে মামলার ধারা বদলের সুযোগও থাকতে পারে।
এখন নজর থাকবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, তদন্তের অগ্রগতি এবং আসামিদের বিরুদ্ধে পুলিশ কী ব্যবস্থা নেয়, সেদিকে। শারমিন গ্রুপের পক্ষ থেকে অভিযোগ নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া এখনো পাওয়া যায়নি।

