জয়পুরহাটে জুলাইযোদ্ধাদের মধ্যে বিনা মূল্যে ল্যাপটপ বিতরণ এবং সার ডিলারশিপ বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ফয়সাল আলিম। শনিবার, ১৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি এসব অভিযোগ করেন। পোস্টটি প্রকাশের পর দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। তবে অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রকল্প বা নথির বিবরণ তিনি তুলে ধরেননি।
পোস্টে ফয়সাল আলিম লেখেন, ল্যাপটপগুলো ভাগাভাগি করে নিজেদের মধ্যে ‘খেয়ে ফেলা’ হয়েছে। তাঁর দাবি, গত ছয় মাসে বিভিন্ন প্রকল্প থেকে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ করে ‘খাওয়া’ হয়েছে। এখন আর কিছু অবশিষ্ট না থাকায় সেই ‘খাওয়া’ বন্ধ হয়ে গেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সার ডিলারশিপ বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এই নেতা। তাঁর অভিযোগ, নির্যাতিত নেতা-কর্মীদের বাদ দিয়ে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। কয়েকজন নিজেদের আত্মীয়দের সুযোগ করে দিয়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন। পোস্টের শেষে তিনি লেখেন, তিনি অবাক হয়ে দেখছেন, জয়পুরহাটের কী হবে।
জয়পুরহাট জেলা পরিষদ সম্প্রতি জুলাইযোদ্ধাদের মধ্যে বিনা মূল্যে ল্যাপটপ বিতরণ করেছে। ওই কর্মসূচির অনিয়ম নিয়ে জানতে চাইলে ফয়সাল আলিম বলেন, কারা ল্যাপটপ ভাগাভাগি করেছেন, তা জয়পুরহাটবাসী জানেন। বিভিন্ন প্রকল্পে কমিশনের বিষয়টিও মানুষের অজানা নয়। তাঁর ভাষ্য, সত্য কথা বলতে হবে। সার ডিলারশিপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সম্প্রতি কারা ডিলার পেয়েছেন, তা প্রকাশ হয়েছে। কেউ শাশুড়ির নামে, কেউ শ্যালকের নামে নিয়েছেন। তাঁর প্রশ্ন, দলে কি নেতা-কর্মীর অভাব ছিল, তাঁরা কেন পেলেন না।
নিজের পোস্টের ব্যাখ্যায় ফয়সাল আলিম দাবি করেন, এটি দলের বিরুদ্ধে নয়, বরং দলের স্বার্থেই দেওয়া। তাঁর কথা, দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কোনো অনিয়ম-দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেন না।
পোস্টের মন্তব্যের ঘরে পক্ষে-বিপক্ষে নানা প্রতিক্রিয়া এসেছে। একজন মন্তব্যকারী লিখেছেন, আরও অনেক কিছু ‘খাওয়া’ আছে এবং এখন সদস্য-চেয়ারম্যান পদের টিকিট টাকার বিনিময়ে বিক্রি হচ্ছে। তবে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ে অর্থ লেনদেনের এই ইঙ্গিতের পক্ষে তিনি কোনো তথ্য দেননি।
ফয়সাল আলিমের সমালোচনাও হয়েছে। এক মন্তব্যকারী বলেছেন, কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে তাঁর নিজের দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও আলোচনায় আসা উচিত। তাঁর দাবি, এ পর্যন্ত কিছু সস্তা পোস্ট আর লোক দেখানো ছবিই চোখে পড়েছে। এ ধরনের বক্তব্য দলের ভেতরে বিতর্ক ও কোন্দল বাড়াতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। আরেকজন পোস্টটিকে জামায়াতের প্রচারের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, এমন বক্তব্যে জামায়াত লাভবান হবে। তাঁর দাবি, ফয়সাল আলিমের বক্তব্য ও ‘হিংসার’ কারণে বিএনপির প্রার্থী মাসুদ রানা প্রধান পরাজিত হয়েছেন। এসব দাবির সমর্থনেও মন্তব্যকারীরা কোনো তথ্য দেননি।
জয়পুরহাট জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলজার হোসেন বিষয়টি নিয়ে সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ফয়সাল আলিমের ফেসবুক পোস্ট তিনি দেখেছেন। তাঁর নিজের একটি পোস্ট পড়তে রুচিতে বেঁধেছে, অথচ অন্য একজনের পোস্টে কারও কিছুই মনে হয়নি। তাঁর এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট নয়, তিনি ঠিক কোন বিষয়ে বা কাকে লক্ষ্য করে কথাগুলো বলেছেন।
ঘটনাটি দলীয় শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনেছে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ের একজন নেতা প্রকাশ্যে সামাজিক মাধ্যমে নিজ দলের স্থানীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুললে একদিকে তা স্বচ্ছতার দাবি তোলে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বিরোধও প্রকাশ্যে আসে। অভিযোগ গুরুতর হলেও নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া তা যাচাই করা কঠিন। জুলাইযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দ সামগ্রীর বিতরণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বিষয়টি স্পর্শকাতরও বটে। এ ক্ষেত্রে জেলা পরিষদের বিতরণ তালিকা ও সার ডিলারশিপ বরাদ্দের নথি প্রকাশ পেলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতো।
এখন নজর থাকবে দল এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা চায় কি না, ফয়সাল আলিম নির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করেন কি না এবং জেলা পরিষদ বা সংশ্লিষ্ট দপ্তর ল্যাপটপ বিতরণ ও ডিলারশিপ বরাদ্দ নিয়ে কোনো বক্তব্য দেয় কি না, সেদিকে।
সূত্র: ইত্তেফাক

