‘নিশাদ ও লিমন ঘর থেকে আমার আব্বুকে ডেকে নিয়ে মেরে ফেলেছে। ওইদিন কোনো ঝগড়া ছিল না। আমি ও আমার ছোট ভাই সামিউল জানালা দিয়ে দেখছিলাম। আব্বুকে মারতে নিষেধ করেছিলাম। আমার আব্বুকে ছেড়ে দিতে বলেছিলাম, তবুও তারা আব্বুকে মেরে ফেলেছে। আমি আমার আব্বুর হত্যাকারীদের বিচার চাই, তাঁদের ফাঁসি চাই।’
নয় বছর বয়সী সাদিয়া আক্তারের কান্নাভেজা কণ্ঠে বাবাকে হারানোর বেদনা আর হত্যাকারীদের বিচারের আকুতি উঠে আসে। কুমিল্লার দেবিদ্বারে দিনমজুর শফিকুল ইসলাম হত্যার ঘটনায় এভাবেই নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বিচার দাবি করেছে শিশুটি।
শফিকুল ইসলাম হত্যা এবং পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে রোববার বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেছেন দেবিদ্বারের এলাকাবাসী। ভূমিহীন সংগঠন ও স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যৌথভাবে এ কর্মসূচির আয়োজন করেন।
রোববার বেলা ১১টায় দেবিদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণ থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি বের হয়। উপজেলা সদরের প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ শেষে মিছিলটি বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নিউমার্কেটের স্বাধীনতা স্তম্ভের সামনে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে মানববন্ধনে অংশ নেন বিক্ষোভকারীরা।
নিহত শফিকুলের ১৭ বছর বয়সী ছেলে ইমন আহমেদ অভিযোগ করে বলে, বাবার হত্যার বিচার চাইতে থানায় গেলে প্রথমে পুলিশ তাঁদের সাক্ষী নিয়ে আসতে বলে। পরে মামলা নেওয়া হলেও এর দুই নম্বর আসামি নিশাদকে এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি। ফলে অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং তাঁদের পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বলে অভিযোগ ইমনের।
শফিকুলের স্ত্রী নার্গিস আক্তারও স্বামী হত্যার বিচার চেয়েছেন। তিনি বলেন, স্বামীর জীবন ভিক্ষা চেয়েও তাঁকে বাঁচাতে পারেননি। তাঁর অভিযোগ, চোখের সামনে স্বামীকে পিটিয়ে, কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হলেও পুলিশ উল্টো তাঁদের কাছে সাক্ষী চেয়েছে। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে সন্তানদের নিয়ে এখন দিশেহারা তাঁরা।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত ১ অক্টোবর দেবিদ্বার উপজেলার বারুর গ্রামে বাঁশ কাটাকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে দিনমজুর শফিকুল ইসলামকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় লিমন, তাঁর ভাই নজরুল ইসলাম এবং নজরুলের ছেলে নিশাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। মামলায় পুলিশ লিমন ও নজরুলকে গ্রেপ্তার করলেও নিশাদ এখনো পলাতক রয়েছেন।
এদিকে গত ৫ অক্টোবর উপজেলার একটি গ্রামে পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুকে চকলেট দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে পরিত্যক্ত ঘরে নিয়ে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে মাজহারুল ইসলাম নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় মামলা হলেও তাঁকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মানববন্ধনে বাংলাদেশ খেতমজুর সমিতির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি পরেশ কর বলেন, দেবিদ্বারে একের পর এক হত্যা, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার মতো অপরাধের ঘটনা ঘটছে। আইনের দুর্বল প্রয়োগের সুযোগে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে এবং ভুক্তভোগীদের হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ভূমিহীন নেতা আব্দুল ওয়াদুদের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে আরও বক্তব্য দেন ভূমিহীন নেতা লিল মিয়া, তজু মিয়া, রমিজ উদ্দিনসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
এ বিষয়ে দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, শফিকুল ইসলাম হত্যা মামলার তিন এজাহারনামীয় আসামির মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। পলাতক আসামি নিশাদ এবং শিশু ধর্ষণচেষ্টার মামলার অভিযুক্ত মাজহারুলকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলছে।

