জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে নতুন সমঝোতা স্মারক সই করেছে বাংলাদেশ ও জাপান। ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত এই সমঝোতার আওতায় আগামী ১ এপ্রিল ২০২৭ থেকে কর্মী নিয়োগ কার্যক্রম শুরুর কথা জানিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এর লক্ষ্য শুধু কর্মী পাঠানো নয়, বরং তাঁদের দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা এবং দুই দেশের মধ্যে নিয়োগসংক্রান্ত সহযোগিতা বাড়ানো। তবে নতুন এই ব্যবস্থায় কতজন কর্মী নেওয়া হবে, কোন কোন পেশায় নিয়োগ হবে এবং কর্মীদের নিয়োগ ব্যয় কত হবে, তা এখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি।
মন্ত্রণালয়ের ১৮ অক্টোবরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নসংক্রান্ত এই সমঝোতা স্মারককে ইএসডিপি এমওসি নামে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং জাপানের পক্ষে দেশটির আইন, পররাষ্ট্র, স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং ন্যাশনাল পুলিশ এজেন্সির প্রতিনিধিরা এতে স্বাক্ষর করেন। সমঝোতার প্রাথমিক মেয়াদ পাঁচ বছর। মেয়াদ শেষে আরও পাঁচ বছরের জন্য এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ানোর বিধান রাখা হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
জাপানে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলেও সেখানে কাজ পেতে শুধু চাকরির আবেদন করলেই হয় না। পেশাভেদে কারিগরি দক্ষতা, জাপানি ভাষায় যোগাযোগের সক্ষমতা এবং নির্দিষ্ট যোগ্যতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। জাপানের নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী বা এসএসডব্লিউ ব্যবস্থায় বর্তমানে পরিচর্যা, নির্মাণ, কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, আবাসনসহ ১৬টি শিল্প খাতে বিদেশি কর্মী নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে নতুন ইএসডিপি এমওসির আওতায় ঠিক কোন কোন খাতে নিয়োগ হবে, তা আলাদাভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে সম্ভাব্য কর্মীদের এখনই কোনো নির্দিষ্ট পেশায় নিশ্চিত চাকরির প্রতিশ্রুতি হিসেবে ঘোষণাটি দেখা উচিত নয়।
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বিদেশি কর্মী নিয়োগ নিয়ে সহযোগিতা অবশ্য নতুন নয়। ২০১৯ সালে দুই দেশ জাপানের নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী ব্যবস্থার সুষ্ঠু পরিচালনা, তথ্য বিনিময় এবং অসাধু মধ্যস্থতাকারীদের কার্যক্রম ঠেকানোর লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছিল। পরে কারিগরি প্রশিক্ষণ ও দক্ষ কর্মী পাঠানোর জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার মধ্যে আরও সমঝোতা হয়েছে। তাই নতুন চুক্তির গুরুত্ব বুঝতে হলে দেখতে হবে, এটি আগের ব্যবস্থাগুলোর তুলনায় কর্মী নিয়োগ, দক্ষতার স্বীকৃতি এবং কর্মীদের সুরক্ষায় কতটা নতুন সুযোগ তৈরি করে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, নতুন সমঝোতার উদ্দেশ্য কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং দুই দেশের মধ্যে নিয়োগসংক্রান্ত সহযোগিতা জোরদার করা। মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, জাপানে কর্মরত স্থানীয় শ্রমিকদের মতো আইনি সুরক্ষা এবং নারী ও পুরুষের সমান সুযোগের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে গর্ভাবস্থা বা সন্তান জন্মদানের কারণে নারী কর্মীকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া কিংবা বৈষম্যমূলক আচরণ করার সুযোগ না রাখার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাস্তবে এসব সুরক্ষা কার্যকর করতে নিয়োগচুক্তি, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি কতটা কার্যকর হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
জাপানে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় হলো নিয়োগের খরচ ও মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা। চাকরির সুযোগের খবরে অনেকেই বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নেন, কিন্তু অতিরিক্ত অর্থ দাবি, অস্পষ্ট চুক্তি কিংবা ভুয়া নিয়োগের কারণে আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিও থাকে। তাই নতুন সমঝোতার কার্যকারিতা শুধু কর্মী পাঠানোর সংখ্যায় নয়, নিয়োগ প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ হচ্ছে এবং কর্মীরা কতটা নিরাপদে বিদেশে যেতে পারছেন, তার ভিত্তিতেও বিচার করতে হবে।
জাপানের নতুন প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান ব্যবস্থা ১ এপ্রিল ২০২৭ থেকে কার্যকর হওয়ার সময়সূচিও নির্ধারিত রয়েছে। তবে দেশটির নতুন ব্যবস্থার কার্যকর হওয়ার তারিখ এবং বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ইএসডিপি এমওসির অধীনে নিয়োগের বিস্তারিত শর্তকে এক বিষয় হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বাংলাদেশের নতুন সমঝোতা কীভাবে ওই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হবে, সে বিষয়ে আরও বিস্তারিত নির্দেশনা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, নতুন চুক্তি জাপানে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সম্ভাবনার একটি পথ খুলতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগ বাস্তব কর্মসংস্থানে রূপ দিতে হলে ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, দক্ষতার স্বীকৃতি এবং স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থাকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। কর্মী নিয়োগের নির্দিষ্ট সংখ্যা, পেশাভিত্তিক শর্ত ও আবেদনপ্রক্রিয়া প্রকাশিত হলে আগ্রহী কর্মীরা আরও পরিষ্কার ধারণা পাবেন। তার আগে ঘোষণাটিকে নিশ্চিত চাকরির সুযোগ নয়, বরং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের নতুন কাঠামো হিসেবে দেখা যুক্তিযুক্ত।

