দেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব বাড়ছে। প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বের হলেও তাঁদের সবার কর্মসংস্থান হচ্ছে না। আবার যাঁরা চাকরি পাচ্ছেন, তাঁদের অনেকেই নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ পাচ্ছেন না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
আইএমএফের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের প্রায় ২৯ শতাংশ বেকার। অন্যদিকে, সংস্থাটির ‘গ্র্যাজুয়েটিং ইনটু আনসার্টেনটি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী উচ্চশিক্ষিত শ্রমশক্তির মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৩৬ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, ওই বছর দেশে মোট বেকারের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৬ লাখ ২৪ হাজার। তাঁদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী ছিলেন প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার। ২০২২ সালের জরিপে মোট বেকারের সংখ্যা ছিল ২৫ লাখ ৮২ হাজার। তাঁদের মধ্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ছিলেন ৭ লাখ ৯৯ হাজার।
উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের অন্যতম কারণ হিসেবে শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি না হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অনেক শিক্ষার্থীর ব্যবহারিক জ্ঞান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, যোগাযোগক্ষমতা, ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতায় ঘাটতি রয়েছে।
আইএমএফের প্রতিবেদনেও শিক্ষিত তরুণদের দক্ষতা ও নিয়োগদাতাদের চাহিদার মধ্যে ব্যবধানের কথা বলা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত কর্মীদের প্রায় ৫০ শতাংশ এমন কাজে নিয়োজিত, যেখানে তাঁদের পর্যায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রয়োজন হয় না। অর্থাৎ, অনেকে নিজেদের যোগ্যতার তুলনায় কম দক্ষতার কাজ করছেন।
চাকরি খোঁজার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বিডিজবস ডটকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফাহিম মাশরুর বলেন, স্নাতক ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়লেও সে অনুপাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি এবং দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। ফলে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। শুধু সনদ অর্জন নয়, কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনও গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৩ অনুযায়ী, ওই বছর দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ৫৩টি। বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৭২টি। এর মধ্যে সরকারি ৫৬টি এবং বেসরকারি ১১৬টি।
এ ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে ২ হাজার ২৫৭টি। এর মধ্যে সরকারি কলেজ ৫৫৫টি। স্নাতক পাস বা ডিগ্রি কোর্স চালু রয়েছে ১ হাজার ৯২১টি কলেজে, স্নাতক সম্মান চালু আছে ৮৮১টি কলেজে এবং স্নাতকোত্তর কোর্স রয়েছে ১৭৬টি কলেজে। পেশাদার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩১৭টি।
উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়লেও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শিক্ষাবিদদের মতে, নতুন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত অনেক কলেজে দক্ষ শিক্ষক, পর্যাপ্ত অবকাঠামো, গবেষণার সুযোগ ও শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিষয় ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে।
ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর বলেন, উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের চাকরির উপযোগী করে গড়ে তোলার ঘাটতি রয়েছে। এ জন্য উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা, পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও স্বল্পমেয়াদি কোর্স চালু করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, বিকল্প পেশাগুলোর সামাজিক স্বীকৃতিও বাড়াতে হবে, যাতে শিক্ষিত তরুণেরা বিভিন্ন ধরনের দক্ষতাভিত্তিক কাজে যুক্ত হতে উৎসাহিত হন।
উচ্চশিক্ষিত বেকারদের মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ থেকে ডিগ্রি নেওয়া শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ রয়েছেন। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ২০২৪ সালের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ থেকে স্নাতক হওয়া শিক্ষার্থীদের ২৮ দশমিক ২৪ শতাংশ বেকার। পুরুষ স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং নারী স্নাতকদের মধ্যে ৩৪ দশমিক ৩১ শতাংশ।
তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ এ চিত্রের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। তাঁর দাবি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৭ শতাংশ শিক্ষার্থী আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। তাঁরা দেশে-বিদেশে বিভিন্ন পেশায় কাজ করছেন এবং দেশের প্রবাসী আয় বৃদ্ধিতেও অবদান রাখছেন। তাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে বেকার তৈরির প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করা বাস্তবসম্মত নয় বলে তিনি মনে করেন।
কর্মসংস্থানের সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় কিছু প্রচলিত কাজের ধরন বদলে যাচ্ছে। ফলে নতুন দক্ষতা অর্জন করতে না পারলে তরুণদের চাকরির বাজারে টিকে থাকা আরও কঠিন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগাযোগ বাড়ানো জরুরি। শিক্ষাক্রমে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, যোগাযোগদক্ষতা, দলগত কাজ এবং সমস্যা সমাধানের অনুশীলন অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, কর্মসংস্থান উপযোগী দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তৃতীয় ভাষা ও কারিগরি শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার মান উন্নয়ন, শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা তৈরি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের সংকট আরও বাড়তে পারে। তাই ডিগ্রির সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বাস্তব কর্মক্ষেত্রের উপযোগী করে তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

