চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ চালুর পর পর্যটক ও সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে ট্রেন ভ্রমণের আগ্রহ বেড়েছে। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এই পথে যাতায়াত করছেন। কিন্তু রেলপথটি যত জনপ্রিয় হচ্ছে, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও তত বাড়ছে। রেলওয়ে পুলিশের হিসাব উদ্ধৃত করে প্রথম আলো জানিয়েছে, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে ট্রেনে কাটা পড়ে ১০১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর পাশাপাশি লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের সঙ্গে অন্য যানবাহনের সংঘর্ষেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। অথচ নতুন নির্মিত দোহাজারী-কক্সবাজার অংশের ৭২টি লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে ৫৬টিতে গেটম্যান ও প্রতিবন্ধকতা নেই।
২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর ১১ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথে নিয়মিত যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হয়। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে এই রুটে চার জোড়া আন্তনগর ট্রেন চলাচল করছে। প্রতিদিন প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার যাত্রী এই পথে যাতায়াত করেন। যাত্রীদের চাহিদা বাড়ায় ২৬ অক্টোবর থেকে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে মহানগর এক্সপ্রেসও চালুর কথা রয়েছে। এতে রেলপথে যাত্রী চলাচল আরও বাড়তে পারে। কিন্তু যাত্রীসংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনার পাশাপাশি নিরাপত্তার ব্যবস্থাও যে সমান গুরুত্ব দাবি করে, সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাগুলো সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, পুরো ১৫২ কিলোমিটার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে ৯৯টি অনুমোদিত লেভেল ক্রসিং রয়েছে। এর বাইরে রয়েছে ৭৭টি অবৈধ পারাপারের পথ। অনুমোদিত ক্রসিংগুলোর মধ্যে ৫৬টিতে গেটম্যান ও নিরাপত্তা প্রতিবন্ধকতা নেই। এসব অরক্ষিত ক্রসিংয়ের সব কটিই দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন নির্মিত অংশে অবস্থিত। অর্থাৎ, ট্রেন আসার সময় যানবাহন ও পথচারীদের রেললাইনে প্রবেশ ঠেকানোর জন্য অনেক জায়গায় কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কিছু ক্রসিংয়ে সড়কের বাঁক, গাছপালা কিংবা আশপাশের স্থাপনার কারণে দূর থেকে ট্রেন দেখা যায় না। কোথাও সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড থাকলেও গেটম্যান নেই। লোহাগাড়ার আধুনগর উচ্চবিদ্যালয়ের কাছে একটি ক্রসিংয়ে এমন সাইনবোর্ডও রয়েছে, যেখানে পথচারী ও যানবাহনকে নিজ দায়িত্বে পারাপারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শুধু একটি সাইনবোর্ড বসিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে বাস্তব ঝুঁকি দূর হয় না। ট্রেনের গতি, চালকের দৃষ্টিসীমা এবং রাস্তা পারাপারের সময় যানবাহনের অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে সেখানে উপযুক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন।
এরই মধ্যে এসব ঝুঁকির পরিণতি দেখা গেছে। গত ২০ সেপ্টেম্বর সাতকানিয়ার কাটঘর মোড় এলাকায় একটি লেভেল ক্রসিংয়ে প্রবাল এক্সপ্রেসের ধাক্কায় অটোরিকশার দুই যাত্রী নিহত হন। পরদিন পটিয়ায় কক্সবাজার এক্সপ্রেসের সঙ্গে একটি কাভার্ড ভ্যানের সংঘর্ষে ট্রেনের একটি বগি লাইনচ্যুত হয়। ওই ঘটনায় কোনো যাত্রী আহত না হলেও ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়েছিল। রেলওয়ের পক্ষ থেকে কিছু ক্রসিংকে অবৈধ বলে উল্লেখ করা হলেও অনুমোদিত ক্রসিংয়েও নিরাপত্তার ঘাটতি থাকায় সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এই রেলপথে ট্রেনে কাটা পড়ে ২৭ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩ জনে। ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরও ৩১ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এসব সংখ্যা যোগ করলে মোট দাঁড়ায় ১০১। তবে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ১৩ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে এই রেলপথে মোট নিহতের সংখ্যা ১০২ উল্লেখ করেছে, যদিও তাদের দেওয়া বছরভিত্তিক হিসাবের যোগফল ১০১। ফলে মোট মৃত্যুর হালনাগাদ অঙ্কে সংবাদ প্রতিবেদনগুলোর মধ্যে সামান্য অমিল রয়েছে।
রেললাইনের আশপাশে অসতর্কভাবে চলাচল, অবৈধ পথে পারাপার এবং অরক্ষিত ক্রসিং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দেড় বছরে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ৫০টির বেশি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এতে যাত্রী আহত হওয়ার পাশাপাশি ট্রেনের জানালার কাচও ভেঙেছে। পাথর নিক্ষেপে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে রেলওয়ে গত সেপ্টেম্বরে পর্যটক এক্সপ্রেসের একটি বগিতে পরীক্ষামূলকভাবে সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছে। তবে ক্যামেরা স্থাপন এক ধরনের অপরাধ শনাক্তে সহায়তা করতে পারে, লেভেল ক্রসিংয়ে সংঘর্ষ বা রেললাইনে কাটা পড়া ঠেকাতে এর পাশাপাশি আলাদা নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের কর্মকর্তারা দুর্ঘটনা এড়াতে সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে কেবল সচেতনতার ওপর নির্ভর করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। রেলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্রসিংয়ে গেটম্যান নিয়োগ, প্রয়োজনীয় প্রতিবন্ধকতা ও সংকেতব্যবস্থা স্থাপন, অবৈধ পারাপারের পথ বন্ধ করা এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে অগ্রাধিকারভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। রেলওয়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, গেটম্যান নিয়োগের প্রস্তাব ও কিছু ক্রসিংয়ে নিরাপত্তা উন্নয়নের সুপারিশ থাকলেও জনবল, অর্থ ও প্রশাসনিক অনুমোদনের কারণে বাস্তবায়ন বিলম্বিত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ পর্যটন ও যাতায়াতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এখানে আরও ট্রেন চালু হলে যাত্রীদের সুবিধা বাড়বে, কিন্তু নিরাপত্তার ঘাটতি রেখে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ালে ঝুঁকিও বাড়তে পারে। একটি আধুনিক রেলপথের সাফল্য শুধু দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো বা যাত্রীসংখ্যা বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নয়; যাত্রাপথ নিরাপদ রাখাও তার মৌলিক শর্ত। তাই দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন বা সতর্কবার্তা প্রচারের পাশাপাশি অরক্ষিত ক্রসিংগুলোতে বাস্তব নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।

