মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব এবার বাংলাদেশের কৃষিতেও নতুন করে একটি দুর্বলতা সামনে এনেছে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের সরবরাহ ব্যাহত হলে শুধু কৃষকের উৎপাদন খরচই বাড়ে না, ফসল উৎপাদন এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্যের বাজারও চাপে পড়ে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর কৃষি অর্থনীতিতে এই ঝুঁকি আরও বেশি। তবে সংকটের মধ্যেই কিছু কৃষক রাসায়নিক উপকরণের বিকল্প হিসেবে কেঁচো সার, প্রাকৃতিক বালাইনাশক ও দেশি বীজ ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন। চ্যানেল নিউজ এশিয়ার (সিএনএ) ‘এ লাইফ উইদাউট অয়েল: বাংলাদেশ ফার্মিং ক্রাইসিস’ শীর্ষক তথ্যচিত্রে এসব সংকটের পাশাপাশি বিকল্প কৃষিপদ্ধতি নিয়ে স্থানীয় কৃষক ও উদ্যোগগুলোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। তথ্যচিত্রটি প্রকাশিত হয় ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
বাংলাদেশে রাসায়নিক সারের চাহিদার বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। দ্য ডেইলি স্টারের জুলাই মাসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রাসায়নিক সারের বার্ষিক চাহিদা ছিল প্রায় ৬৬ লাখ টন। বিপরীতে সরকারি ও সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোর উৎপাদন ছিল ১১ লাখ ৬ হাজার টন। অর্থাৎ, মোট চাহিদার তুলনায় দেশীয় উৎপাদন ছিল এক-পঞ্চমাংশেরও কম। বাকি চাহিদা পূরণে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্যাসের স্বল্পতা ও কারখানার যান্ত্রিক ত্রুটি, যার কারণে চলতি বছর দেশের একাধিক সার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। অক্টোবরের মাঝামাঝি কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন চালুর খবর এলেও ধারাবাহিক উৎপাদনের নিশ্চয়তা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
এই আমদানিনির্ভরতার কারণে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার ধাক্কা সরাসরি দেশের কৃষিতে এসে লাগে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বে বাণিজ্য হওয়া ইউরিয়ার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত সালফারের প্রায় অর্ধেক এই পথ দিয়ে যেত। সার উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ সালফার সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বৈশ্বিক বাজারেও চাপ তৈরি হয়। জুনে সাময়িক সমঝোতার পর কিছু চালান চলাচল শুরু হলেও সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে জাতিসংঘের এক কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সারবাহী জাহাজের চলাচল তখনও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। ফলে বাংলাদেশের জন্য আমদানি ব্যবস্থাপনা, মজুত এবং সময়মতো সার সরবরাহ নিশ্চিত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সরবরাহের সংকটের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের রাসায়নিকনির্ভর কৃষিপদ্ধতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার ফসলের ফলন ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। কিন্তু প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বা ভুলভাবে প্রয়োগ করলে মাটির জৈব পদার্থ, উপকারী অণুজীব এবং পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। দ্য ডেইলি স্টার–এ ১০ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে কীটনাশক আমদানি ১৯৯০ সালে প্রায় ৩ হাজার মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ২০২১ সালে ৪৫ হাজার টনের বেশি হয়েছে। একই প্রতিবেদনে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের গবেষণার বরাতে বলা হয়, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষিজমিতে মাটির জৈব পদার্থ কমে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এসব তথ্য দেখায়, কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মাটির দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য রক্ষা করাও জরুরি।
তবে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক পুরোপুরি বাদ দিলেই সব সমস্যার সমাধান হবে, এমন সিদ্ধান্তও বাস্তবসম্মত নয়। কোন ফসলে কী পরিমাণ পুষ্টি দরকার, কোন পোকা নিয়ন্ত্রণে কোন পদ্ধতি কার্যকর এবং স্থানীয় মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে কোন বিকল্প মানানসই, তা বিবেচনা করতে হয়। তাই অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের বদলে মাটির পরীক্ষা অনুযায়ী সার প্রয়োগ, জৈব উপাদানের ব্যবহার এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মতো পদ্ধতিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এতে কৃষকের খরচ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে, আবার মাটির স্বাস্থ্যও দীর্ঘ মেয়াদে রক্ষা করা সম্ভব।
টাঙ্গাইলের মধুপুরে আনারস চাষে কেঁচো সার বা ভার্মিকম্পোস্ট ব্যবহারের অভিজ্ঞতা এই পরিবর্তনের একটি উদাহরণ। সিএনএ ইনসাইডারের তথ্যচিত্রে এমন কৃষকদের কাজ তুলে ধরা হয়েছে, যারা রাসায়নিক সারের পাশাপাশি মাটিতে জৈব উপাদান ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য কেঁচো সার ব্যবহার করছেন। ভার্মিকম্পোস্ট জৈব বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি হয় এবং মাটিতে জৈব পদার্থ যোগ করতে সহায়তা করে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনেও দেখা যায়, মধুপুরে কয়েকজন আনারসচাষি রাসায়নিকমুক্ত চাষের দিকে ঝুঁকছেন। উৎপাদন খরচ কমানো, তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়া এবং নিরাপদ ফলের জন্য ক্রেতাদের আগ্রহ তাদের এই পরিবর্তনে উৎসাহ দিচ্ছে। তবে এসব অভিজ্ঞতা থেকে পুরো অঞ্চলের সব কৃষক একই পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
তথ্যচিত্রে ঝিনাইদহের নারী কৃষকদেরও দেখানো হয়েছে, যারা রাসায়নিক বালাইনাশকের বিকল্প হিসেবে প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে নিজেরাই বালাইনাশক তৈরি করছেন। একইভাবে চট্টগ্রামে দেশি বীজ সংরক্ষণ ও উৎপাদন নিয়ে কাজ করা উদ্যোগের কথাও উঠে এসেছে। স্থানীয় জলবায়ু, মাটি ও বৃষ্টির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া দেশি জাতের বীজ কিছু ক্ষেত্রে চাষের জন্য উপযোগী বিকল্প হতে পারে। তবে ফলন, রোগ প্রতিরোধ, বীজের মান এবং বাজারে চাহিদার মতো বিষয় যাচাই না করে কোনো একটি পদ্ধতিকে সব ফসলের জন্য উপযুক্ত বলা যায় না। কৃষকদের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি গবেষণা, মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শও প্রয়োজন।
বাংলাদেশের কৃষিতে এই পরিবর্তন এখনো পুরো ব্যবস্থার রূপান্তর নয়; বরং সংকটের মধ্যে তৈরি হওয়া কয়েকটি বাস্তব উদ্যোগ। এগুলো বড় পরিসরে কাজে লাগাতে হলে কৃষকের প্রশিক্ষণ, মানসম্মত জৈব সার ও প্রাকৃতিক বালাইনাশকের সহজলভ্যতা, স্থানীয় বীজ গবেষণা এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য বাজার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের আমদানিনির্ভরতা কমানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি জরুরি মজুত ও সরবরাহব্যবস্থাও শক্তিশালী করা জরুরি। হরমুজ প্রণালির মতো দূরবর্তী সমুদ্রপথে সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব বাংলাদেশের মাঠে এসে পড়ে—এই অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিয়েছে, খাদ্যনিরাপত্তা শুধু কতটা জমিতে কত ফসল ফলানো হচ্ছে, তার হিসাব নয়। কৃষি উপকরণের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ, সুস্থ মাটি এবং কৃষকের বিকল্প বেছে নেওয়ার সক্ষমতাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

