মামলার জট কমানোর লক্ষ্যে ২০২৫ সাল থেকে চট্টগ্রামে ৬৩টি নতুন আদালত ও ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা হয়েছে। তবে আদালতের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়েনি অবকাঠামোগত সুবিধা। ফলে কয়েকটি আদালতকে একই এজলাস ভাগাভাগি করে বিচারকাজ পরিচালনা করতে হচ্ছে। পাশাপাশি তিন লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন থাকায় বিচারক, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের নানা সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।
আদালত সূত্র ও সরকারি গেজেটের তথ্য অনুযায়ী, এজলাসের সংকটের পাশাপাশি আইনজীবীদের জন্য পর্যাপ্ত চেম্বার ও বসার জায়গার অভাব এবং আদালত এলাকায় যানজট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সড়কের পাশে হকারদের দখল ও যত্রতত্র গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে আদালতে প্রবেশ ও চলাচলেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
আইনজীবীদের মতে, মামলার জট কমাতে নতুন আদালত স্থাপন ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত না করলে এর সুফল পুরোপুরি পাওয়া কঠিন।
চট্টগ্রামের আদালত চত্বর ঘুরে দেখা গেছে, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের একই এজলাসে অর্থঋণ আদালত-২ ও ৩-এর কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। একইভাবে জেলা ও মহানগরের শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল দুটিও একটি এজলাস ভাগাভাগি করে চলছে।
পারিবারিক আদালত-২ ও ৩ একই এজলাসে বিচারকাজ পরিচালনা করছে। এ ছাড়া পারিবারিক আপিল আদালত ও ভূমি জরিপ আপিল ট্রাইব্যুনালের জন্যও রয়েছে একটি এজলাস।
ছয়টি যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালতের—২ থেকে ৭ নম্বর আদালত—জন্য এজলাস রয়েছে মাত্র তিনটি। ফলে বিচারকদের পালাক্রমে বিচারকাজ পরিচালনা করতে হচ্ছে।
শুনানির সময়সূচি আগে থেকে নির্ধারিত থাকায় সরাসরি বিচারকাজে বিলম্ব হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে এজলাস ভাগাভাগির কারণে বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
চট্টগ্রামের সুগন্ধা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মুজিবুল হক একটি চেকসংক্রান্ত মামলায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে আদালতে যাতায়াত করছেন। তিনি বলেন, কোন আদালতের কার্যক্রম কখন চলছে, তা সব সময় বুঝতে পারেন না। যানজট ও অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে আদালত চত্বরে চলাচলও কঠিন হয়ে পড়ে।
একাধিক মামলার বিচারপ্রার্থী সাইফুল ইসলাম জানান, আদালতের কার্যক্রম নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়লে তাঁকে প্রায়ই আইনজীবীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করতে হয়। কখনো কখনো এই বিভ্রান্তির কারণে আদালতে হাজিরাও দিতে পারেন না বলে জানান তিনি।
আইনজীবী মোহাম্মদ রেদওয়ান বলেন, একই এজলাসে একাধিক আদালতের কার্যক্রম চলায় স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি মামলার নথিপত্র সংরক্ষণ এবং সাক্ষী ও বিচারপ্রার্থীদের বসার জায়গার সংকটও তৈরি হচ্ছে।আদালতের নথি অনুযায়ী, চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালত ও ট্রাইব্যুনালে তিন লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
এর মধ্যে আটটি মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে প্রায় ৭০ হাজার, মহানগর দায়রা জজ আদালতগুলোতে ৫০ হাজার এবং জেলা ও দায়রা জজ আদালতগুলোতে দেড় লাখ মামলা রয়েছে। এ ছাড়া চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, সাতটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এবং অন্যান্য আদালত ও ট্রাইব্যুনালে আরও ৫০ হাজারের বেশি মামলা বিচারাধীন।
২০২৫ সালে ৫৬টি এবং চলতি বছর আরও সাতটি নতুন আদালত ও ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক আদালত, অর্থঋণ আদালত, দায়রা জজ আদালত, বাণিজ্যিক আদালত এবং মাদকসংক্রান্ত আদালত ও ট্রাইব্যুনাল।
চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লাল আদালত ভবনটি ব্রিটিশ আমলে নির্মিত। পরে ২০০৮ সালে আরেকটি আদালত ভবন নির্মাণ করা হয়। ২০১৩ সালে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে সেখানে বিচারিক কার্যক্রম চালু হয়। আদালত সূত্র জানায়, এরপর নতুন আদালত ও ট্রাইব্যুনাল বাড়লেও আর কোনো আদালত ভবন নির্মাণ করা হয়নি।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির নিবন্ধিত আইনজীবীর সংখ্যা প্রায় ৯ হাজার ৩০০। তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত চেম্বার ও বসার ব্যবস্থা নেই।
দোয়েল ও শাপলাসহ সমিতির ছয়টি ভবনে প্রায় ১ হাজার ৮৫৭ জন আইনজীবীর স্থায়ী চেম্বারের ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া চারটি মিলনায়তনে চেয়ার ও ড্রয়ারসহ আরও ৪৯২ জনের বসার সুযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে বসার ব্যবস্থা আছে ২ হাজার ৩৪৯ জনের।
তবে মিলনায়তনের আসন স্থায়ী চেম্বারের বিকল্প নয়। ফলে অনেক আইনজীবীকে নিজস্ব কর্মস্থল ছাড়াই কাজ করতে হচ্ছে। আইনজীবীদের ভাষ্য, ছোট একটি চেম্বারে প্রায়ই তিন থেকে চারজনকে বসতে হয়, যেখানে মক্কেলদের বসার পর্যাপ্ত জায়গা থাকে না। নবীন আইনজীবীদের চেম্বার পেতেও বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়।
চট্টগ্রামের আদালতপাড়ায় রাস্তার পাশের দোকান, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং ও যানজটের কারণে প্রতিদিন হাজারো মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। আদালত ও সরকারি দপ্তরে আসা মানুষের পাশাপাশি সাধারণ যানবাহন এবং আসামি বহনকারী প্রিজন ভ্যান চলাচলেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
গত ২৩ জুলাই আইনজীবী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খান চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতিকে দেওয়া এক চিঠিতে আদালত এলাকায় যানবাহন চলাচলের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং যত্রতত্র পার্কিং বন্ধে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
এরপর সমিতির পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার ও জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন এবং অবৈধ পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
গত ২০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেনকে দেওয়া আরেক চিঠিতে আবদুর রহমান সড়কে দুটি যাত্রীছাউনি নির্মাণের অনুরোধ জানায় সমিতি। আদালতে আসা বিচারপ্রার্থী, শিক্ষার্থী ও অন্যান্য পথচারীর সুবিধার কথা বিবেচনা করে এ উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মঈনুদ্দিন বলেন, পর্যাপ্ত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অভাব ও রাস্তার পাশের হকারদের কারণে আদালত এলাকায় যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ কমিশনারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। হকারদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানান তিনি।
মঈনুদ্দিন আরও বলেন, আদালতের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য বারবার অনুরোধ জানানো হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি খুব কম। তাঁর মতে, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করে শুধু আদালতের সংখ্যা বাড়ালে মামলার জট কমানো এবং সময়মতো বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

