দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার ও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ১৫০টি গ্যাসকূপ খনন, তিন থেকে চারটি নতুন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল স্থাপন এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে করসুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার।
সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) আয়োজিত ‘টেকসই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি: বাংলাদেশে বিনিয়োগের চালিকাশক্তি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব পরিকল্পনার কথা জানান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
মন্ত্রী বলেন, গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি নতুন এলএনজি টার্মিনাল উন্নয়নে দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
দেশে গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) মাধ্যমে ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থায়ও গ্যাস অনুসন্ধান চালানো হবে বলে জানান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী।
গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় তিন থেকে চারটি নতুন ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এ জন্য মাতারবাড়ীর পাশাপাশি খুলনার কাছে গভীর সমুদ্রের একটি নতুন স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, প্রস্তাবিত স্থানটির গভীরতা প্রায় ২০ মিটার। সেখানে বড় জাহাজ থেকে সরাসরি তেল ও এলএনজি খালাস করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে একটি জ্বালানি হাব গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়াতেও উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কর অব্যাহতি ও অন্যান্য প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বাড়ির ছাদ এবং শিল্পকারখানায় সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের বিষয়েও উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, এসব ব্যবস্থা থেকে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সাধারণ বিদ্যুতের প্রচলিত ট্যারিফের চেয়ে বেশি দামে কেনার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। এতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে ব্যক্তি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
জ্বালানি খাতের পাশাপাশি ব্যাংকিং, রাজস্ব ও পুঁজিবাজারে সংস্কারের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। তাঁর মতে, অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক বাধা দূর করা গেলে ব্যবসার ব্যয় কমবে এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নীতিনির্ধারণ ও নীতি বাস্তবায়নের দায়িত্ব আলাদা করার মাধ্যমে স্বার্থের সংঘাত কমানো এবং দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান তিনি।
বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হংকংয়ের পুঁজিবাজারে একটি বিশেষ বিনিয়োগ তহবিল গঠনের বিষয়টিও বিবেচনা করছে সরকার। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। এতে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ও বন্ডবাজারে উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আসার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা জ্বালানি নিরাপত্তাকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত করেছে।
সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা এবং দেশ থেকে পুঁজি পাচারের সমস্যা মোকাবিলার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার ও অর্থনীতি স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ধীরে ধীরে দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি খাত স্থিতিশীল হবে। এর ফলে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ফিরবে এবং প্রবৃদ্ধির গতি বাড়বে।
আলোচনা সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন শেভরন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শু শিয়ং, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তামিম, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ এবং বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের প্রশাসক ফজলুল হক। এ ছাড়া দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও বিনিয়োগকারীরাও সভায় অংশ নেন।

