কারখানার ছাদ একসময় শুধু ভবনের ওপরের অব্যবহৃত জায়গা ছিল। এখন সেই ছাদ থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করে নিজেদের শিল্পকারখানার জ্বালানি চাহিদা মেটাচ্ছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। দেশের বিভিন্ন স্থানে নিজেদের ২৫টি কারখানার ১১০টি স্থাপনার প্রায় ৩৫ লাখ বর্গফুট ছাদে সৌরপ্যানেল বসিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ৪৩ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলেছে। এ কাজে এখন পর্যন্ত বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা। আগামী দুই বছরে এই সক্ষমতা ২৫০ মেগাওয়াটের বেশি করার পরিকল্পনা রয়েছে গ্রুপটির। এ জন্য সৌরবিদ্যুৎ খাতে মোট প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। নাটোরের প্রাণ অ্যাগ্রো লিমিটেডের কারখানা ঘুরে এসব তথ্য তুলে ধরেছেন প্রথম আলোর প্রতিবেদক আবদুল্লাহ আল মামুন।
নাটোরের প্রাণ অ্যাগ্রো কারখানার পাকা ছাদ ও টিনের শেডজুড়ে সারি সারি সৌরপ্যানেল বসানো হয়েছে। এখানে নুডলস, সস, সরিষার তেল ও মসলাসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি হয়। এসব পণ্য দেশের বাজারে বিক্রির পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা হয়। দিনের বেলায় সৌরপ্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কারখানার যন্ত্রপাতি চালাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রাণ-আরএফএলের দাবি, তাদের কারখানাগুলোর মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় ১৮ শতাংশ এখন সৌরবিদ্যুৎ থেকে আসে। তবে ৪৩ মেগাওয়াট হলো স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা, সারাক্ষণ সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের হিসাব নয়। সূর্যের আলো ও দিনের সময়ের ওপর নির্ভর করে বাস্তবে উৎপাদনের পরিমাণ ওঠানামা করে।
গ্রুপটির দেশজুড়ে ৪৭টির বেশি শিল্পপার্ক ও কারখানা রয়েছে। এসব স্থাপনায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২৫০ মেগাওয়াট। বর্তমানে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ, নিজস্ব গ্যাসভিত্তিক উৎপাদন ও সৌরবিদ্যুতের সমন্বয়ে এই চাহিদা মেটানো হয়। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য, দুই বছরের মধ্যে ছাদে সৌরপ্যানেল বসিয়ে নিজেদের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আরও বাড়ানো। এ ক্ষেত্রে শুধু কারখানার ছাদ নয়, শিল্পপার্কের খালি ও অব্যবহৃত জায়গাও কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ, নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আলাদা জমি খোঁজার পাশাপাশি আগে থেকেই থাকা শিল্প অবকাঠামোকে ব্যবহার করেই উৎপাদন বাড়াতে চাইছে প্রতিষ্ঠানটি।
সৌরপ্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের সবটুকু সব সময় কারখানায় ব্যবহার করা যায় না। দিনের কোনো সময়ে উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি হলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যায়। প্রাণ-আরএফএলের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নাটোর, রাজশাহী ও নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি কারখানা থেকে ইতিমধ্যে নেট মিটারিং ব্যবস্থায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়া হচ্ছে। এই ব্যবস্থায় গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের ইউনিটের সঙ্গে গ্রিড থেকে নেওয়া বিদ্যুতের হিসাব সমন্বয় করা হয়। ফলে আলাদা ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ জমিয়ে না রেখেও দিনের অতিরিক্ত উৎপাদন থেকে আর্থিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব হয়। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে নেট মিটারিং একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা; এ জন্য ২০২৫ সালে নির্দেশিকাও হালনাগাদ করা হয়েছে।
শুধু নিজেদের কারখানায় বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, জাতীয় পর্যায়েও সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা করছে প্রাণ-আরএফএল। গ্রুপটি মৌলভীবাজারের গোবিন্দপুরে ১০০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সোলার প্রকল্পের সহকারী মহাব্যবস্থাপক তৌহিদুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির জমি কেনা ও অর্থায়নসহ বিভিন্ন প্রস্তুতিমূলক কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। শিগগিরই প্যানেল স্থাপনসহ অন্যান্য কাজ শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া আরও সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য সরকারের কাছ থেকে জমি ইজারা নেওয়ার বিষয়েও কাজ করছে গ্রুপটি। তবে এসব প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু ও বাণিজ্যিক উৎপাদনের নির্দিষ্ট সময়সূচি প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়নি।
সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগের পেছনে পরিবেশগত কারণও তুলে ধরছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রাণ-আরএফএলের দাবি, তাদের বর্তমান সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার কারণে বছরে প্রায় ৬০ হাজার টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ এড়ানো সম্ভব হচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়লে গ্রিডের জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের কাছে পণ্য তৈরির পরিবেশগত প্রভাবও ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য উৎপাদনে জ্বালানি ব্যবহারের ধরন ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতার অংশ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশেও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে সরকারি উদ্যোগ রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি এবং স্রেডার নেট মিটারিং নির্দেশিকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ গ্রিড-সংযুক্ত গ্রাহকদের নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে বড় পরিসরে এ ধরনের বিনিয়োগ বাড়াতে স্থাপনের খরচ, অর্থায়ন, ছাদের কাঠামোগত সক্ষমতা, গ্রিডে সংযোগ এবং উৎপাদিত বিদ্যুতের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। প্রাণ-আরএফএলের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে; একই সঙ্গে অব্যবহৃত শিল্প অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর একটি বড় উদাহরণ তৈরি হতে পারে।

