বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। চার বছরের কাজ ১৪ বছরেও শেষ হয়নি। ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা, অথচ যে বিশেষ বাস চালানোর জন্য প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল, সেই বাস একদিনও নামেনি। উল্টো ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ২০ কিলোমিটার অংশে যানজট ও মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। এবার বিদ্যমান অবকাঠামোকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তর করার পথে হাঁটছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গত রোববার মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়। পরদিন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এক পত্রে সভার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিআরটি করিডরের স্টেশন ও লেন বিভাজক সরিয়ে সড়কটিকে তিন থেকে ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের প্রস্তাব করা হয়েছে। দুটি দুই লেনের উড়ালসড়ককে চার লেনে রূপান্তরের কথাও বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট উন্নয়নসহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে আইনগত জটিলতা মিটিয়ে প্রকল্প বন্ধের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম নিতে বলা হয়েছে। বিআরটি পরিচালনার জন্য গঠিত ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি বন্ধ করে এর কার্যক্রম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) অধীনে নেওয়ার প্রস্তাবও মন্ত্রিসভা গ্রহণ করেছে।
সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। অগ্রগতি ১৫ দিনের মধ্যে মন্ত্রণালয়কে জানাতে হবে। কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন পাঠাতে হবে।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রিসভায় চারটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়। এক, প্রকল্প বাতিল করা। দুই, অসমাপ্ত কাজ শেষ করে বিআরটি বাস কিনে চালু করা। তিন, পথটি যেমন আছে তেমন রেখে বিশেষ বাস ও বিদ্যমান বেসরকারি বাস চলতে দেওয়া। চার, পথটিকে টোলের আওতায় এনে পরিচালনা করা। শেষ পর্যন্ত বাতিলের বিকল্পটিই বেছে নেওয়া হয়। এর ফলে বিদ্যমান স্টেশন এবং লেন আলাদা করতে বানানো বিভাজক ভেঙে ফেলতে হবে। উড়ালপথ ভবিষ্যতে সম্প্রসারণ করা হবে।
সিদ্ধান্তের আগে প্রকল্পের কারিগরি দিক পর্যালোচনা করেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি বিশেষজ্ঞ দল। নেতৃত্বে ছিলেন পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের গঠিত দুটি কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে তাঁরা গত বছরের অক্টোবরে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেন। তাতে প্রকল্প পুরোপুরি বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামো উন্নত মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়। প্রতিবেদনে প্রকল্পটিকে দেশের অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ‘পদ্ধতিগত ব্যর্থতার’ উদাহরণ বলা হয়েছে। কারিগরি যাচাই, দক্ষ জনবল ও জবাবদিহির অভাবে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মত দিয়েছে দলটি। পরিকল্পনা ও নকশার ত্রুটি এবং সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কথাও এসেছে।
অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, সম্ভাব্য সব বিকল্পের মধ্যে সবচেয়ে ভালো হলো প্রকল্প বাতিল করা। তাঁর ভাষ্য, বিআরটি চালু হলে গাজীপুরের মানুষ শুধু বিমানবন্দর পর্যন্ত আসতে পারতেন, এরপর আবার বাস বদলাতে হতো, যা বাস্তবসম্মত নয়। প্রকল্প বাতিল করে উচ্চগতির মহাসড়কে রূপান্তর করলে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলের ব্যবহারকারীরা সুবিধা পাবেন। তিনি আরও বলেন, ১৪ বছর ধরে গাজীপুরবাসী ও এই পথের যাত্রীরা দুর্ভোগ সয়েছেন, তাঁদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা উচিত। রেলের তৃতীয় ও চতুর্থ লাইনের কাজ শেষ পর্যায়ে থাকায় কমলাপুর পর্যন্ত কমিউটার ট্রেন চালুর পরামর্শ দেন তিনি।
প্রকল্পটির কারিগরি সীমাবদ্ধতাও সামনে এসেছে। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে উত্তরা থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত আরেকটি বিআরটি পথ নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু গাজীপুর-বিমানবন্দর পথ সময়মতো চালু না হওয়ায় দ্বিতীয় প্রকল্প বাতিল হয়ে যায়। ফলে এই অংশের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। এ ছাড়া দেশের বিদ্যমান বাসের দরজা বাঁ দিকে, কিন্তু বিআরটির স্টেশনগুলো এমনভাবে বানানো যে বাসের দরজা হতে হবে ডান দিকে। বিশ্বজুড়ে বিআরটি লেনে ডান দিকে দরজার বাসই চলে। তবে এমন বাস চালু হলে তা গাজীপুর-বিমানবন্দর পথের বাইরে চলতে পারত না।
প্রকল্পের ইতিহাসও দীর্ঘ ব্যর্থতার। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ২০১২ সালে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্প নেয়। এর মধ্যে ১৫ দশমিক শূন্য ৭ কিলোমিটার সড়কপথ, বাকিটা উড়ালপথ। সড়কের মাঝখানে দুটি আলাদা লেনে বিশেষ বাস চলার কথা ছিল, প্রতিদিন যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্য ছিল প্রায় ২৫ হাজার। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা ও গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটির অর্থায়নে প্রকল্পটি এগোচ্ছিল।
প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে কাজ শেষ করে ২০১৭ সাল থেকে স্বয়ংক্রিয় দরজার বাস চালুর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু কাজ শেষ হয়নি। তিন দফা সংশোধনে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রায় দ্বিগুণ। ২০২৫ সালে চতুর্থ দফায় ব্যয় ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একনেক সেই প্রস্তাব অনুমোদন করেনি। বরং বিকল্প খুঁজতে এবং নকশার ত্রুটির জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
মাঠপর্যায়ের চিত্রও হতাশাজনক। বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কের মাঝখানে ১৫টি স্টেশনের অবকাঠামো তৈরি হলেও একটিরও কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। কয়েকটি পদচারী-সেতুতে চলন্ত সিঁড়ি ও লিফট বসানো হলেও অনেকগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কোথাও যন্ত্রপাতিতে জং ধরেছে, কোথাও অবকাঠামো ভেঙে পড়ছে। লেন আলাদা করতে সড়কের মাঝখানে সিমেন্টের প্রতিবন্ধক ও কোথাও লোহার বেড়া বসানোয় সড়কের জায়গা কমেছে। কোথাও উড়ালপথ, কোথাও সমতল সড়ক, কোথাও আবার সরু লেন থাকায় যান চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। নির্মাণকাজ চলাকালে ক্রেনসহ নানা দুর্ঘটনায় সাতজনের প্রাণহানিও হয়েছে। এই পথ দিয়ে বৃহত্তর ময়মনসিংহ, উত্তরবঙ্গ ও টাঙ্গাইলের মানুষ যাতায়াত করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা ও নকশা শেষ হওয়ার আগেই প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কাজ শুরুর পর দেখা যায়, এলাকায় যথাযথ পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই, ফলে পানি জমে। সেবা সংস্থার লাইন সরানোর পরিকল্পনাও আগে থেকে ছিল না। ব্যস্ত সড়কে কাজ চলার সময় যান চলাচল সচল রাখার বিকল্প ব্যবস্থাও ছিল না। বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল সওজ, সেতু বিভাগ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। ২০১৩ সালে গঠিত ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানিতে এখন ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ১৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন। বাস কেনা না হওয়ায় তাঁদের কাজ সীমিত। প্রকল্প বাতিল হলে স্টেশনগুলো ভাঙতে হবে, আর লিফটসহ যন্ত্রপাতি অন্যত্র ব্যবহারের পরিকল্পনা আছে সওজের।
বুয়েটের প্রতিবেদনে দায় নির্ধারণের সুপারিশও আছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রস্তুতকারী, নকশা প্রণয়নকারী পরামর্শক এবং পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে যুক্ত সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। অর্থায়নকারী সংস্থা, প্রকল্প পরিচালনা কমিটি, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) ও পরিকল্পনা কমিশনের ভূমিকাও পর্যালোচনার সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে সবাই সিদ্ধান্তে একমত নন। গাজীপুর ঐতিহ্য ও উন্নয়ন নামের একটি সংগঠন প্রকল্প সম্পন্ন করে বিশেষ বাস চালুর দাবি জানিয়ে আসছে। সংগঠনের সভাপতি মো. শামসুল হক বলেন, ১৪ বছর গাজীপুরবাসী অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতেছেন। প্রকল্পের কাজ ৯৭ শতাংশ শেষ হওয়ার পর বাতিল করা ঠিক হবে না। তাঁরা সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে চিঠি দেবেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সও (বিআইপি) গত বছর এক সেমিনারে প্রায় একই যুক্তি দিয়েছিল। তাদের হিসাবে, প্রকল্প বাতিল হলে স্টেশন, র্যাম্প ও চলন্ত সিঁড়ি সরানো এবং ঠিকাদারদের ক্ষতিপূরণ দিতে এক হাজার কোটি টাকার বেশি লাগতে পারে।
বিশ্বের ১৯১টি শহরে বিআরটি ব্যবস্থা চালু আছে, যেখানে প্রতিদিন সোয়া তিন কোটি যাত্রী যাতায়াত করেন। ভারতের ১৩টি শহরে ২২৮ কিলোমিটার বিআরটিতে যাত্রী প্রায় পাঁচ লাখ, চীনে প্রায় ৪৪ লাখ এবং তাইওয়ানে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ। বাংলাদেশ এই তালিকায় প্রথম পদক্ষেপেই হোঁচট খেল।
সরকারের সিদ্ধান্তে আপাতত দীর্ঘ অনিশ্চয়তার একটি অধ্যায় শেষ হচ্ছে, তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে বহু। এত টাকা খরচের পর স্টেশন ভাঙার খরচ কত হবে, ঠিকাদারদের ক্ষতিপূরণ কীভাবে মেটানো হবে এবং উন্নয়নসহযোগীদের সঙ্গে আইনগত জটিলতা কীভাবে মিটবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন জবাবদিহি। বুয়েটের সুপারিশ অনুযায়ী দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা না নিলে একই ধরনের ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে। গাজীপুরের যাত্রীদের জন্য বিকল্প গণপরিবহন, বিশেষ করে কমিউটার ট্রেন চালুর উদ্যোগও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

