নাটোরের বনপাড়ায় ভয়াবহ বাস-ট্রাক সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। দুর্ঘটনার সময় বাসটির চালকের আসনে ছিলেন সুপারভাইজার সোহেল রানা। অন্যদিকে বাসের চালক ও তাঁর সহকারী পেছনের আসনে ঘুমাচ্ছিলেন বলে জানিয়েছেন দুর্ঘটনাকবলিত বাসের তিন যাত্রী। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো তদন্ত করে নিশ্চিত করা হয়নি।
মঙ্গলবার ভোরে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়ায় নাটোর-পাবনা মহাসড়কে আরপি স্পেশাল পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে প্রাণ হারান ১৪ জন। আহত হয়েছেন অন্তত ৩২ জন। দুর্ঘটনার পর আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়।
বাসটির যাত্রী চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রমজান আলী জানান, তিনি চালকের আসন থেকে দুই সারি পেছনে বসেছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাসটি রাত আনুমানিক তিনটার দিকে পাবনার ঈশ্বরদীতে পৌঁছালে চালক নিজের আসন ছেড়ে দেন। এরপর সুপারভাইজার সোহেল রানা বাস চালাতে শুরু করেন। বাসের দরজা বন্ধ করে চালক ও তাঁর সহকারী পেছনের আসনে গিয়ে ঘুমাতে যান। প্রায় এক ঘণ্টা পর বনপাড়ায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রাকের সঙ্গে বাসটির সংঘর্ষ হয়।
দুর্ঘটনায় আহত হয়ে রমজান আলী বনপাড়া পাটোয়ারী হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য মঙ্গলবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে হাসপাতাল ছাড়েন তিনি। প্রথম আলোকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি দুর্ঘটনার আগে বাসের চালকের আসনে পরিবর্তনের বিষয়টি তুলে ধরেন।
বাসটির আরও দুই যাত্রী ইয়াকুব আলী ও আব্দুস সালামও একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন। তাঁরা জানান, দুর্ঘটনার সময় বাস চালাচ্ছিলেন সুপারভাইজার। চালক ও তাঁর সহকারী তখন পেছনের আসনে ছিলেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাসটি সোমবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে বরগুনা শহর থেকে যাত্রা শুরু করে। ঈশ্বরদীতে কিছুক্ষণ বিরতির পর আবার চলতে শুরু করলে চালকের আসনে বসেন সুপারভাইজার। এর কিছু সময় পরই দুর্ঘটনাটি ঘটে।
সুপারভাইজার সোহেল রানার মৃত্যু
দুর্ঘটনায় নিহত সুপারভাইজার সোহেল রানার বয়স ছিল ৩৮ বছর। তাঁর বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফরাদপুর গ্রামে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি আগে বাস চালাতেন। প্রায় দুই বছর আগে চালকের কাজ ছেড়ে সুপারভাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান রয়েছে।
মঙ্গলবার দুপুরে সোহেল রানার মরদেহ বাড়িতে পৌঁছালে পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের মধ্যে শোকের মাতম শুরু হয়। তাঁদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে বাড়ির পরিবেশ। স্বজনদের পাশাপাশি প্রতিবেশী ও স্থানীয় লোকজনও সেখানে ভিড় করেন।
তদন্তের অপেক্ষায় দুর্ঘটনার কারণ
দুর্ঘটনার সময় বাসটি কে চালাচ্ছিলেন, সে বিষয়ে যাত্রীদের বক্তব্য সামনে এলেও দুর্ঘটনার কারণ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। বনপাড়া হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক আলমগীর হোসেন জানিয়েছেন, ঘটনাটি তদন্ত করা হবে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়।
এ ঘটনায় চালকের আসন পরিবর্তন, দীর্ঘ পথে চালকের বিশ্রাম এবং যাত্রীবাহী বাস চালানোর দায়িত্ব কার হাতে ছিল—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে দুর্ঘটনার দায় নির্ধারণের জন্য প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।
বনপাড়ার এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ১৪ জনের প্রাণহানি এবং অন্তত ৩২ জনের আহত হওয়ার ঘটনা সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে আবারও উদ্বেগ তৈরি করেছে। তদন্তে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারিত হলে ঘটনার পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হবে।

