উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন বাংলাদেশের বহু তরুণ। প্রত্যাশা ছিল ভালো বেতনের চাকরি করে পরিবারের অভাব ঘোচাবেন। কিন্তু তাঁদের অনেকেরই চাকরির বদলে ঠাঁই হয়েছে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে। কেউ প্রাণ হারিয়েছেন, কেউ নিখোঁজ, আবার কেউ গুরুতর আহত অবস্থায় দেশে ফেরার আকুতি জানাচ্ছেন। পরিবারের কাছে পৌঁছাচ্ছে মৃত্যুর খবর, কিন্তু মিলছে না মরদেহ কিংবা ক্ষতিপূরণ।
গত তিন বছরে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধে অন্তত ৫৪ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা কত, তা নিশ্চিত করে বলার মতো তথ্য নেই। অনেককে কাগজে-কলমে নিখোঁজ দেখানো হচ্ছে। পরিবারের সদস্যরা তাঁদের মৃত বলে ধারণা করলেও মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক প্রমাণ না থাকায় মরদেহ দেশে আনা বা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে না।
চাকরির বদলে যুদ্ধের ময়দান
লালমনিরহাটের আবদুল্লাহ আল মামুন পরিবারের ভাগ্য ফেরানোর আশায় রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রশিক্ষণ শেষে তাঁকে যুদ্ধে পাঠানোর আগের দিন ছোট ভাই মো. রনিকে ফোন করে তিনি বলেন, যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে, আর দেখা না-ও হতে পারে। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে তাঁর আর যোগাযোগ হয়নি।
পরে মামুনের সঙ্গে রাশিয়ায় যাওয়া এক ব্যক্তি তাঁর মৃত্যুর খবর জানান। পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও পরিবার মৃত্যুর নিশ্চিত প্রমাণ পায়নি। ঋণগ্রস্ত পরিবারটির সামনে এখন অনিশ্চয়তা। এক বছরের সন্তানকে নিয়ে দিশেহারা তাঁর স্ত্রী।
গত ৭ মে ঢাকা থেকে ৩০ জন বাংলাদেশি রাশিয়ায় যান। নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে চাকরির কথা বলে তাঁদের প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের কয়েকটি দলে ভাগ করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। তাঁদের অনেকে জুনের ১২ ও ১৩ তারিখের দিকে মারা যান বলে আহত হয়ে দেশে ফেরা দুজন জানিয়েছেন।
নিখোঁজ মানেই কি মৃত্যু?
যুদ্ধে আহত হয়ে মস্কোর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের আদনান হোসেন। পেটে স্প্লিন্টারের আঘাত নিয়ে তাঁর তিন দফা অস্ত্রোপচার হয়। প্রায় দুই মাস হাসপাতালে থাকার পর তিনি সেখান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসে যান। পরে ভ্রমণের বৈধ অনুমতিপত্র নিয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরেন।
আদনানের ভাষ্য, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কেউ ফিরে না এলে তাঁকে নিখোঁজ বলা হয়। নিহত বাংলাদেশিদের বিষয়ে রাশিয়া সব সময় তথ্য প্রকাশ করে না, মরদেহও দেশে পাঠানো হয় না।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত চার-পাঁচ মাসে রাশিয়া সরকার যুদ্ধক্ষেত্রে নিখোঁজ ও নিহত বাংলাদেশিদের বিষয়ে দূতাবাসকে তথ্য দিচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৪০ জনের তথ্য জানানো হয়েছে। তবে তাঁদের মধ্যে কতজন নিহত আর কতজন নিখোঁজ, তা আলাদা করে জানানো হয়নি। আরও ২০ জনের মৃত্যুর বিষয়ে রাশিয়ার পক্ষ থেকে তথ্য পাওয়া যায়নি।
রাশিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. নজরুল ইসলাম বলেছেন, ৯০ শতাংশের বেশি কর্মী স্বেচ্ছায় যুদ্ধে গেছেন বলে রাশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। সর্বশেষ ৩০ জনের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা হয়েছে এবং এ বিষয়ে লিখিত প্রমাণ রয়েছে বলে রাশিয়ার কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে। তবে মরদেহ হস্তান্তর না করায় সেগুলো দেশে আনা সম্ভব হচ্ছে না।
মানব পাচারের অভিযোগ, এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
এসআরবি জানিয়েছে, চলতি বছরের ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপের মাধ্যমে ওই ৩০ জন বাংলাদেশি রাশিয়ায় যান। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে চাকরির আশ্বাস দিয়ে তাঁদের পাঠানোর পর রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় মানব পাচার চক্রের অন্যতম হোতা হিসেবে অভিযুক্ত জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান ও আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে ১৩ অক্টোবর গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওই ৩০ জনকে পাঠানোর সঙ্গে যুক্ত তিন প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করেছে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়।
বাংলাদেশ দূতাবাসও কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। দূতাবাসের অনুমোদন ছাড়া কর্মী পাঠানোর অভিযোগ যাচাই এবং নিয়োগপত্র অনুযায়ী তাঁদের কাজে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে রাশিয়ার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসানের মতে, মানব পাচারে অভিযুক্ত এজেন্সিগুলো রাশিয়ায় কর্মী পাঠাচ্ছে। কতজন সেখানে গিয়ে কাজ পেয়েছেন, কতজন নিখোঁজ কিংবা কতজন মারা গেছেন—তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই। তিনি নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা তৈরির জন্য হটলাইন চালুর পরামর্শ দিয়েছেন।
বাড়ছে রাশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সংখ্যা
বাংলাদেশের জন্য রাশিয়া নতুন শ্রমবাজার হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০২২ সালে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর দেশটিতে কর্মী পাঠানোর প্রবণতা বাড়ে। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে রাশিয়া যেতে ছাড়পত্র নিয়েছিলেন মাত্র ৩৭ জন। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৯৫ জনে। ২০২৫ সালে ছাড়পত্র নেন ৪ হাজার ৭২৫ জন। চলতি বছরের ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত এ সংখ্যা ৩ হাজার ১০৫।
গত চার বছরে রাশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য ৯৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির নামে ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বন্যা বিজয় ওভারসিজ একাই প্রায় আড়াই হাজার কর্মীর ছাড়পত্র নিয়েছে, যা মোটের ২৭ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অন্য দেশে কর্মী পাঠানোর নামে পাচারের অভিযোগ ও মামলা রয়েছে। রাশিয়ায় কর্মী পাঠানোর বিষয়েও অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির সার্ভার লক করে দেওয়া হয়েছে।
সরকারি সংস্থা বোয়েসেলও রাশিয়ায় কর্মী পাঠিয়েছে। তবে কয়েকটি অপ্রীতিকর ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট দুটি কোম্পানি কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। গত এক বছরে বোয়েসেল নতুন কোনো চাহিদাপত্র পায়নি বলে প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
ক্ষতিপূরণ পেতেও জটিলতা
বিদেশে কোনো কর্মী মারা গেলে তাঁর মরদেহ দেশে আনা এবং পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড মরদেহ আনার খরচ বহন করতে পারে। দেশে মরদেহ আসার পর দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা এবং পরে ৩ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। পাশাপাশি জীবনবিমা ও বিদেশে পাওনা ক্ষতিপূরণ আদায়ের সুযোগ আছে।
কিন্তু রাশিয়ায় নিহত বলে ধারণা করা কর্মীদের মৃত্যুর প্রমাণ না থাকায় তাঁদের পরিবার আবেদন করতে পারছে না। ফলে মরদেহ ফেরত আনা কিংবা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার পথও বন্ধ হয়ে আছে। রাশিয়া থেকে মরদেহ আনার কোনো আবেদন এখন পর্যন্ত কল্যাণ বোর্ডে জমা পড়েনি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, নিশ্চিত চাকরির তথ্য যাচাই ও সত্যায়ন ছাড়া কাউকে ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে না। বিভিন্ন দেশ হয়ে অনেকে অন্যভাবেও রাশিয়ায় যাচ্ছেন। এ বিষয়ে সব দূতাবাসকে সতর্ক করা হয়েছে এবং প্রবাসী কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে উচ্চ বেতন ও রাশিয়ার নাগরিকত্ব পাওয়ার সম্ভাবনার প্রলোভনে দেশটিতে যাওয়ার প্রবণতা থামেনি। এর মধ্যে প্রতারণার শিকার হয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন অনেকে। তাঁদের কেউ নিহত, কেউ নিখোঁজ, আবার কেউ আহত অবস্থায় আটকে আছেন। আর দেশে থাকা পরিবারগুলো অপেক্ষা করছে প্রিয়জনের নিশ্চিত খবরের—যে খবর না এলে শোকের স্বীকৃতি, মরদেহ ফেরত কিংবা ক্ষতিপূরণ, কোনোটিই নিশ্চিত হচ্ছে না।

