বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৭ হাজার ৯৬৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতনতার অভাব শিশুদের সড়কে চলাচলকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের (আরএসএফ) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে নয়টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন সংবাদমাধ্যম, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং ফাউন্ডেশনের নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নিহত শিশুদের মধ্যে ২ হাজার ৯৫৮ জন, অর্থাৎ ৩৭ দশমিক ১৪ শতাংশ, মোটরসাইকেলে চড়া বা মোটরসাইকেল চালানোর সময় প্রাণ হারিয়েছে। এ ছাড়া রাস্তা পারাপার কিংবা সড়কের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় যানবাহনের ধাক্কায় মৃত্যু হয়েছে ২ হাজার ৮১২ শিশুর, যা মোট মৃত্যুর ৩৫ দশমিক ৩১ শতাংশ।
রাস্তা পারাপার বা সড়কের পাশে হাঁটার সময় নিহত শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে তিন চাকার যানবাহনের কারণে। সিএনজিচালিত অটোরিকশা, অন্যান্য অটোরিকশা এবং নসিমন ও ভটভটির মতো স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের ধাক্কায় মারা গেছে ১ হাজার ২৭১ শিশু, যা এ ধরনের দুর্ঘটনায় নিহত পথচারী শিশুর ৪৫ দশমিক ১৯ শতাংশ।
অন্যদিকে বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও পিকআপের মতো ভারী যানবাহনের কারণে প্রাণ গেছে ১ হাজার ১২৬ শিশুর। এ সংখ্যা নিহত পথচারী শিশুর ৪০ দশমিক ০৪ শতাংশ। ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের কারণে নিহত হয়েছে আরও ৩১৭ শিশু, যা ১১ দশমিক ২৭ শতাংশ।
সড়কের ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শিশুদের সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে গ্রামীণ সড়কে। এসব সড়কে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ৭১৩ শিশু, যা মোট মৃত্যুর ৩৪ দশমিক ০৭ শতাংশ।
আঞ্চলিক সড়কে নিহত হয়েছে ২ হাজার ৮২ শিশু বা ২৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। মহাসড়কে প্রাণ গেছে ১ হাজার ৯৭৪ শিশুর, যা ২৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ। শহরের সড়কে নিহত হয়েছে ১ হাজার ১৯৪ শিশু বা ১৫ শতাংশ।
দিনের কোন সময়ে শিশুদের বেশি মৃত্যু হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে বিকেলে। এ সময়ে মারা গেছে ২ হাজার ৬৩৪ শিশু, যা মোট মৃত্যুর ৩৩ দশমিক ০৭ শতাংশ।
সকালে নিহত হয়েছে ২ হাজার ১৬৮ শিশু বা ২৭ দশমিক ২২ শতাংশ। দুপুরে মারা গেছে ১ হাজার ৮১৩ শিশু, যা ২২ দশমিক ৭৬ শতাংশ। রাতে ৫৯৮, সন্ধ্যায় ৫৪৬ এবং ভোরে ২০৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
শিশুদের বয়সভিত্তিক তথ্যেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশের বয়স ১৩ থেকে ১৭ বছর। এ বয়সী ৩ হাজার ৫৪৭ শিশু প্রাণ হারিয়েছে, যা মোট মৃত্যুর ৪৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এ ছাড়া ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী ২ হাজার ৮৮৪ শিশু এবং শূন্য থেকে ৫ বছর বয়সী ১ হাজার ৫৩২ শিশু নিহত হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া বা সেখান থেকে ফেরার পথে প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ৫১৩ শিশু, যা মোট নিহতের ৩১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। আর বাড়ির কাছাকাছি সড়কে খেলাধুলার সময় দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৯৬২ শিশু বা ১২ দশমিক ০৮ শতাংশ।
সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুদের এই প্রাণহানি সড়ক নিরাপত্তা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকার আশপাশে নিরাপদ চলাচলের পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।

