চলতি বছরের প্রথম সাড়ে ৯ মাসেই দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ১৫ হাজার ছাড়িয়েছে। ২০০০ সালে ডেঙ্গু রোগীর তথ্য সংরক্ষণ শুরুর পর সংক্রমণের হিসাবে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। অন্যদিকে, গত মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) পর্যন্ত এ রোগে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৫৭ জন। মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে গত ২৬ বছরের মধ্যে এটি তৃতীয় সর্বোচ্চ।
তবে এই পরিসংখ্যান কেবল হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের হিসাবের ভিত্তিতে তৈরি। উপসর্গ নিয়ে বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়া, পরীক্ষা না করানো কিংবা হাসপাতালের বাইরে চিকিৎসা নেওয়া রোগীরা এ হিসাবের অন্তর্ভুক্ত নন। ফলে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ওই বছর এ রোগে মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন। মৃত্যুর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ড হয় ২০২৪ সালে, যখন প্রাণ হারান ৫৭৫ জন। ২০২৪ সালে হাসপাতালে ভর্তি হন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন এবং ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জনে। গত বছর ডেঙ্গুতে মারা যান ৪১৩ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩৬৬ জন।
রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যু বাড়তে থাকলেও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রচেষ্টার কোনো ঘাটতি নেই। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করছেন। তবে বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে কার্যকর উদ্যোগের অভাব এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দুর্বলতার কারণে ডেঙ্গু পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও আর্দ্রতার ধরনে পরিবর্তন আসছে। এর সঙ্গে এডিস মশার বিস্তার ও আচরণেও পরিবর্তন ঘটছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ ছিটানো ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়েও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসায় প্রচলিত কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ডেঙ্গু প্রিভেনশন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের (ডিপিএফবি) সাধারণ সম্পাদক ও জাপানের ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স টোকিওর গবেষক ডা. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ খান বলেন, মশা নিধনের কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে লোকদেখানো কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। শুধু ওষুধ ছিটিয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে সেখানে কার্যকরভাবে লার্ভা ধ্বংস করতে হবে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; সাধারণ মানুষকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। সরকার কাজ করলেও মানুষকে সচেতন করা এবং প্রতিরোধ কার্যক্রমে যুক্ত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও ‘স্কুল অ্যাম্বাসাডর’ কার্যক্রম চালুর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে পরিবার ও সমাজেও ডেঙ্গু প্রতিরোধের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।
ডা. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ খান আরও বলেন, মশক নিধন এবং এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ এক বিষয় নয়। তাই প্রচলিত কর্মসূচিতে পরিবর্তন এনে এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করা, লার্ভা ধ্বংস এবং নিয়মিত তদারকির ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু উড়ন্ত মশা মারার পরিবর্তে মশার বংশবিস্তার বন্ধ করতে পারলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো এলাকায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়লে তা পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন। তবে পরিকল্পিত মশক নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, প্রজননস্থল ধ্বংস এবং কার্যকর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
একসময় বর্ষাকালকে ডেঙ্গুর প্রধান মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সাধারণত জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এ রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যেত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বছরের অন্য সময়েও ডেঙ্গুর বিস্তার দেখা যাচ্ছে। ফলে শুধু বর্ষাকালকে কেন্দ্র করে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা, বৃষ্টি ও আর্দ্রতার পরিবর্তন ঘটছে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। ফলে এডিস মশার বিস্তার এবং ডেঙ্গু সংক্রমণের ধরন বদলে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের কৌশল নতুন করে সাজাতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রশমন বা মিটিগেশন এবং অভিযোজন বা অ্যাডাপটেশন—দুটি পদ্ধতি রয়েছে। মশক নিয়ন্ত্রণে যুক্ত সংস্থাগুলোর পক্ষে বড় পরিসরে প্রশমন কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হলেও অভিযোজনের মাধ্যমে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। পরিবেশ ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে এডিস মশার আচরণে যেসব পরিবর্তন ঘটছে, সেগুলো শনাক্ত করে সে অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি।
এদিকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখন আর শুধু রাজধানীতে সীমাবদ্ধ নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া পাঁচজনের মধ্যে দুজন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালের রোগী। বরিশাল সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় দুজন এবং রংপুর সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় একজনের মৃত্যু হয়েছে।
একই সময়ে নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ১১০ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ১১৩ জন ভর্তি হয়েছেন। ঢাকার দুই সিটির বাইরে ঢাকা বিভাগের অন্যান্য হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪১৫ জন। এ ছাড়া বরিশালে ১৯১, চট্টগ্রামে ১০৫, খুলনায় ১৪১, ময়মনসিংহে ৮০, রাজশাহীতে ১২৮, রংপুরে ৭২ ও সিলেটে ১১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায় রোগীর এই বিস্তার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দেশব্যাপী সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নজরদারি জোরদার এবং চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বছরজুড়ে পরিকল্পিত প্রতিরোধ কার্যক্রম চালানো জরুরি।

