রাস্তার পাশে পিঠা, পুরি বা পেঁয়াজুর দোকান হোক কিংবা রেস্তোরাঁ, বেকারি বা খাদ্যপণ্য উৎপাদনের কারখানা, নির্ধারিত শ্রেণির খাদ্য ব্যবসা পরিচালনা করতে এবার বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) নিবন্ধন বা লাইসেন্স নিতে হবে। আগামী ১ নভেম্বর থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ জন্য আবেদন করতে বলেছে কর্তৃপক্ষ। প্রচলিত ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসার প্রথমবার নিবন্ধন বিনা মূল্যে করা যাবে। তবে বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে ব্যবসার ধরন অনুযায়ী লাইসেন্স ও অতিরিক্ত অনুমোদন নিতে হবে। নতুন ব্যবস্থার লক্ষ্য শুধু ব্যবসার হিসাব রাখা নয়, খাদ্য উৎপাদন ও বিপণনে জবাবদিহি বাড়ানো এবং অনিয়ম হলে দায়ী প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করা সহজ করা।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এ উদ্যোগের আওতায় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের খাদ্য ব্যবসা। রেস্তোরাঁ, বেকারি, ফলের রসের দোকান, পেস্ট্রি শপ, ক্যাটারিং সেবা, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারী এবং প্যাকেটজাত খাবার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন নিতে হবে। পাশাপাশি নির্ধারিত শ্রেণির খাদ্য আমদানিকারক, পাইকারি খাদ্য ব্যবসায়ী, খাদ্য সংরক্ষণাগার ও কোল্ড স্টোরেজ পরিচালনাকারীরাও এ ব্যবস্থার আওতায় আসবেন। এমনকি রাস্তার পাশে পিঠা, পুরি ও পেঁয়াজুর মতো খাবার বিক্রি করেন, এমন ব্যবসায়ীদেরও নিবন্ধন নিতে হবে।
প্রবিধানমালায় ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসার জন্য নিবন্ধনের বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট চার শ্রেণির ব্যবসা ও খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক লাইসেন্স, খাদ্যস্থাপনার লাইসেন্স, খাদ্য উৎপাদন বা আমদানির লাইসেন্স এবং সংশ্লিষ্ট পণ্যের নিবন্ধন নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ সব ব্যবসার জন্য একই ধরনের অনুমোদন যথেষ্ট হবে না। কে কোন ধরনের খাবার তৈরি করছেন, কোথায় করছেন এবং কীভাবে তা বাজারজাত করছেন, তার ওপর নির্ভর করবে প্রয়োজনীয় নিবন্ধন বা লাইসেন্সের ধরন।
সাধারণ খাদ্য ব্যবসার পাশাপাশি বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও আলাদা অনুমোদন লাগবে। শিশুদের ফর্মুলা দুধ, নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য তৈরি খাবার, স্বাস্থ্য সহায়ক ও সম্পূরক খাদ্য, প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক খাদ্য এবং নিউট্রাসিউটিক্যালের উৎপাদন, আমদানি, মজুত ও বিপণনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য লাইসেন্স নিতে হবে। জিনগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত খাদ্য, জৈব খাদ্য, কিরণ প্রয়োগ করা খাদ্য, নতুন ধরনের খাদ্য এবং পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ খাবারের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট বিধান মেনে অনুমোদন নিতে হবে।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন থাকলেই তার তৈরি সব ধরনের পণ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত হয়ে যায় না। পণ্যের ধরন ও ব্যবসার কার্যক্রম অনুযায়ী অতিরিক্ত লাইসেন্স বা পণ্য নিবন্ধনের প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য উপকারিতা বা রোগের ঝুঁকি কমানোর দাবি করে বাজারজাত করা খাবারের ক্ষেত্রেও আলাদা নিয়ম মানতে হবে।
প্রচলিত ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসার প্রথমবার নিবন্ধনের জন্য কোনো ফি দিতে হবে না। তবে বিশেষায়িত খাদ্যপণ্য এবং যেসব ব্যবসার জন্য লাইসেন্স প্রয়োজন, সেসব ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফি প্রযোজ্য হবে। খাদ্যস্থাপনার লাইসেন্সের ফি প্রতিষ্ঠানের আয়তন অনুযায়ীও নির্ধারিত হয়েছে। ফলে ছোট দোকান ও বড় খাদ্য কারখানার ক্ষেত্রে খরচ এক হবে না।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে সংশ্লিষ্ট জেলা কার্যালয়ে নিবন্ধন ও লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা যাবে। পর্যায়ক্রমে অনলাইনে আবেদন গ্রহণের ব্যবস্থাও চালুর উদ্যোগ রয়েছে। আবেদন করার আগে ব্যবসার ধরন অনুযায়ী কোন অনুমোদন লাগবে, কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে এবং কত টাকা ফি দিতে হবে, তা প্রবিধানমালার দশম তফসিল থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
নতুন ব্যবস্থায় শুধু ব্যবসা নিবন্ধন করাই নয়, খাদ্যপণ্যের প্যাকেটে বিএফএসএ নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ করার বিধানও রয়েছে। এর ফলে কোনো পণ্যের উৎপাদক বা বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করা সহজ হবে। পণ্য নিয়ে অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচয় খুঁজে বের করতেও এই নম্বর কাজে আসতে পারে।
তবে নিবন্ধন নম্বর থাকলেই কোনো খাদ্যপণ্য নিরাপদ, এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। পণ্যের মান বজায় রাখা, স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ এবং নিরাপদ খাদ্যসংক্রান্ত অন্যান্য শর্ত পূরণ করাও জরুরি। নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মেয়াদ হবে তিন বছর। এরপর নির্ধারিত নিয়মে নবায়ন করতে হবে। যেসব ব্যবসার জন্য নিবন্ধন বা লাইসেন্স বাধ্যতামূলক, সেগুলো প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া পরিচালনা করলে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ অনুযায়ী দণ্ডের মুখে পড়তে হতে পারে।
নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬ গত ১৬ জুলাই সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়। এখন নির্ধারিত ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১ নভেম্বর থেকে আবেদন করতে বলেছে কর্তৃপক্ষ। এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে শুধু কত প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন নিল তার ওপর নয়, বরং নিয়মিত তদারকি, পণ্যের মান যাচাই এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও। কারণ খাবারের ব্যবসায় স্বচ্ছতা বাড়লে ভোক্তারা যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতাও স্পষ্ট হবে।

