শারদীয় দুর্গাপূজা ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে টানা পাঁচ দিনের অবকাশে দেশের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে বেড়েছে ভ্রমণপিপাসু মানুষের আনাগোনা। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে ছুটি কাটাতে অনেকেই ছুটছেন সমুদ্রসৈকত, পাহাড় আর প্রকৃতিঘেরা বিভিন্ন গন্তব্যে। পর্যটকের বাড়তি চাপে গাজীপুর, কক্সবাজার, কুয়াকাটা ও বান্দরবানের অনেক হোটেল ও রিসোর্টের কক্ষ আগেই বুকিং হয়ে গেছে। শেষ মুহূর্তে ভ্রমণের পরিকল্পনা করা ব্যক্তিদের তাই থাকার জায়গা খুঁজতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর ২০২৬) প্রকাশিত দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছুটিকে কেন্দ্র করে রাজধানীর আশপাশের অবকাশযাপন কেন্দ্রগুলোতেও আবাসনের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ঢাকার কাছাকাছি হওয়ায় গাজীপুরের বিভিন্ন রিসোর্টে ছুটির সময় পর্যটকদের বাড়তি চাপ দেখা যাচ্ছে। অনেকেই দীর্ঘ যাত্রার ঝামেলা এড়িয়ে পরিবার নিয়ে প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটাতে চাইছেন। ফলে আগেভাগে কক্ষ বুকিং না দিলে পছন্দের রিসোর্টে থাকার সুযোগ পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভাবাল রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা এবং সারা রিসোর্টে আগামী শনিবার পর্যন্ত রাতযাপনের জন্য সব কক্ষ বুকিং হয়ে গেছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে দিনের বেলায় ঘুরে আসার ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যদিকে, ড্রিম স্কয়ার রিসোর্টে সীমিতসংখ্যক কক্ষ খালি ছিল।
মুন্সীগঞ্জের ধলিস অ্যাম্বার নিবাসেও সব কক্ষ পূর্ণ হয়ে গেছে। বিপুল চাহিদার কারণে ইচ্ছা থাকলেও অনেক অতিথিকে জায়গা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী মেহজুবা ইসলাম নাহিন।
পর্যটকদের এমন চাপের মধ্যে রিসোর্ট ব্যবসায়ীদের অনেকে এবার ছুটিকালীন ছাড় না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। চাহিদা বেশি থাকায় কক্ষ ভাড়া কমানোর প্রয়োজন দেখছেন না তাঁরা।
দেশের প্রধান সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারেও পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম ঘটেছে। হোটেল ও মোটেলের প্রায় ৯০ শতাংশ কক্ষ ইতোমধ্যে বুকিং হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদারের প্রত্যাশা, পাঁচ দিনের ছুটিতে প্রতিদিন গড়ে দেড় লাখ পর্যটক সেখানে যেতে পারেন। সে হিসাবে পুরো ছুটিতে পর্যটকের সংখ্যা সাত লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জেলাটিতে পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল ও কটেজ রয়েছে বলেও তিনি জানান।
সমুদ্রসৈকতে গোসল ও ঘোরাঘুরির পাশাপাশি পর্যটকেরা যাচ্ছেন মেরিন ড্রাইভ, হিমছড়ি জলপ্রপাত, দরিয়ানগর, ইনানী ও পাটুয়ারটেকের মতো আকর্ষণীয় স্থানে। পর্যটকদের নিরাপত্তায় লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী সৈকত এলাকায় উদ্ধারকর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। পাশাপাশি পর্যটন পুলিশ ও জেলা পুলিশ নিরাপত্তা কার্যক্রম জোরদার করেছে।
অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, হয়রানি ও পর্যটনসেবায় অনিয়ম ঠেকাতে হোটেল, রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি চালাচ্ছে প্রশাসন।
দক্ষিণাঞ্চলের সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটাতেও পর্যটকদের আগমন বেড়েছে। আগামী ২৩ ও ২৪ অক্টোবর আয়োজিত দুই দিনের পর্যটন উৎসবকে ঘিরে আবাসনকেন্দ্রগুলোতে বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়েছে। বড় হোটেলগুলোর অনেক কক্ষের বুকিং প্রায় পূর্ণ হয়ে গেছে।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি এম এ মোতালেব শরীফ জানিয়েছেন, পর্যটন উৎসব উপলক্ষে ২৩ অক্টোবর সব হোটেলে কক্ষভাড়ায় ৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কুয়াকাটায় প্রায় ৩০০টি হোটেল, মোটেল ও অতিথিশালা রয়েছে। এর মধ্যে ১০৭টি প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট মালিক সমিতির সঙ্গে যুক্ত। সব মিলিয়ে সেখানে আনুমানিক ৫০ হাজার পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে চাহিদা আরও বেড়ে গেলে আবাসনের সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
পাহাড়ি সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত বান্দরবানেও হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের অধিকাংশ কক্ষ আগেভাগে বুকিং হয়ে গেছে। ফলে আগে থেকে ব্যবস্থা না করে সেখানে পৌঁছানো পর্যটকদের কম খরচের আবাসন খুঁজতে হচ্ছে। কেউ কেউ আত্মীয়স্বজনের বাসায় থাকার পরিকল্পনাও করছেন।
সাজেক ভ্যালিতে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়া ইশান আহমেদ রাকিব জানিয়েছেন, পছন্দের হোটেলে থাকার সুযোগ পেয়েছেন আগাম বুকিং করার কারণে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পর্যটকের চাপের ফলে খাবারের দামও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে।
দীর্ঘ ছুটি পর্যটননির্ভর ব্যবসার জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও স্থানীয় পর্যটনসেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এ সময়ে বাড়তি ব্যবসার প্রত্যাশা করছেন। অন্যদিকে, বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াত ও অবস্থান নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা এবং সেবার মান বজায় রাখাও জরুরি হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে আবাসনের চাহিদা বেড়ে গেলে পর্যটকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় কিংবা খাবারের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার মতো অনিয়মের আশঙ্কা থাকে। এ কারণে প্রশাসনের নজরদারির পাশাপাশি পর্যটকদেরও আগাম বুকিং, ভাড়ার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া এবং ভ্রমণের আগে গন্তব্যের সর্বশেষ পরিস্থিতি জেনে নেওয়া প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে দুর্গাপূজার টানা ছুটিতে দেশের পর্যটন খাত বেশ প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। তবে পর্যটকের এই বাড়তি আগমনকে দীর্ঘমেয়াদে কাজে লাগাতে হলে শুধু আবাসনের ব্যবস্থা বাড়ালেই হবে না, নিরাপদ ভ্রমণ, মানসম্মত সেবা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে।

