জাস্টিস প্রজেক্টের ‘রুল অব ল ইনডেক্স ২০২৬’-এ বাংলাদেশ দুই ধাপ এগিয়ে ১২৫তম থেকে ১২৩তম অবস্থানে উঠেছে। বিশ্বের ১৪৩টি দেশ ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে এই অবস্থান কাগজে-কলমে অগ্রগতি হলেও বাস্তবে তা বৈশ্বিক গড়ের অনেক নিচে। এমনকি কেনিয়া, জিম্বাবুয়ে ও নাইজেরিয়ার মতো কয়েকটি আফ্রিকান দেশও আইনের শাসনের এই মাপকাঠিতে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে। সূচকের মৌলিক অধিকার ও দেওয়ানি বিচারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দেশের অবস্থান বিশ্বের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর কাছাকাছি।
সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ০ থেকে ১ নম্বরের মধ্যে ০.৩৯৩। গত বছর এই স্কোর ছিল ০.৩৯১। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে স্কোর বেড়েছে ০.৬ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের ১৫তম শীর্ষ অগ্রগতি অর্জনকারী দেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি করা দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তবে বৈশ্বিক গড় স্কোর ০.৫৫। বাংলাদেশ সেই গড়ের অনেক নিচেই রয়ে গেছে।
তালিকায় বাংলাদেশের ঠিক সামনে রয়েছে জিম্বাবুয়ে (১২২তম) ও নাইজেরিয়া (১২০তম)। আরও এগিয়ে আছে সিয়েরা লিওন (১১০তম), লাইবেরিয়া (১০৩তম) ও কেনিয়া (১০০তম)। ঘানার অবস্থান ৬২তম। এই তুলনা দেখায়, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে থাকা অনেক দেশও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তুলনামূলক ভালো করছে।
সূচকটি আটটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে তৈরি। এগুলো হলো সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি, উন্মুক্ত সরকার, মৌলিক অধিকার, আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োগ, দেওয়ানি বিচার এবং ফৌজদারি বিচার। এর মধ্যে মাত্র তিনটিতে বাংলাদেশের উন্নতি হয়েছে। সেগুলো হলো সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োগ। বাকি পাঁচটি মানদণ্ডে অবস্থার অবনতি হয়েছে। অর্থাৎ সামগ্রিক স্কোর বাড়লেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চিত্র উদ্বেগজনক।
সবচেয়ে দুর্বল জায়গা মৌলিক অধিকার সুরক্ষা। এই মানদণ্ডে বাংলাদেশের স্কোর ০.৩০ এবং অবস্থান ১৩৩তম। এটি সূচকের সর্বনিম্ন স্থানে থাকা ১১টি দেশের একটি। এই মানদণ্ডে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে মৌলিক মানবাধিকার সুরক্ষার অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়। দ্বিতীয় দুর্বলতম ক্ষেত্র দেওয়ানি বিচার। এতে স্কোর ০.৩৬ এবং অবস্থান ১৩২তম। নাগরিকেরা দেওয়ানি বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেদের অভিযোগ কতটা সহজে নিষ্পত্তি করতে পারেন, তা এই মানদণ্ডে মাপা হয়।
অন্যান্য মানদণ্ডের অবস্থান নিম্নরূপ। নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োগে স্কোর ০.৪০, অবস্থান ১২৪তম। ফৌজদারি বিচারে স্কোর ০.৩২, অবস্থান ১১৭তম। ঘুষ, অনুচিত প্রভাব ও সরকারি সম্পদের অপব্যবহার পরিমাপক দুর্নীতির অনুপস্থিতিতে স্কোর ০.৩৫, অবস্থান ১১৩তম। আইনি জবাবদিহিতা পরিমাপক সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতায় স্কোর ০.৩৮, অবস্থান ১১১তম।
তুলনামূলক ভালো অবস্থান উন্মুক্ত সরকার মানদণ্ডে। এখানে স্কোর ০.৪১ এবং অবস্থান ১০৬তম। এই মানদণ্ডে সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহির ব্যবস্থা এবং নীতিনির্ধারণে জনগণের অংশগ্রহণ বিবেচনা করা হয়। আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায় স্কোর ০.৬৩ এবং অবস্থান ১০৭তম। সমাজ ব্যক্তি ও সম্পত্তির নিরাপত্তা কতটা কার্যকরভাবে দিতে পারছে, তা এই মানদণ্ডে দেখা হয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালো অবস্থানও শতাধিক ধাপ পেছনে। অর্থাৎ কোনো ক্ষেত্রেই দেশটি শীর্ষ অর্ধে নেই।
বার্ষিক হিসাবে সামান্য উন্নতি হলেও দীর্ঘমেয়াদি চিত্র ভিন্ন। সংস্থাটির কান্ট্রি প্রোফাইল অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশে আইনের শাসনের সামগ্রিক স্কোর ০.৮ শতাংশ কমেছে। এই সময়ে স্কোর ০.৪০ থেকে নেমে প্রায় ০.৩৯-এ দাঁড়িয়েছে। পাঁচ বছরে আটটি মানদণ্ডের মধ্যে ছয়টিতেই অবনতি হয়েছে।
এই সময়ে সবচেয়ে বেশি অবনতি হয়েছে দেওয়ানি বিচারে, ৪.২ শতাংশ। এরপর উন্মুক্ত সরকারে ২.৮ শতাংশ, মৌলিক অধিকারে ১.৫ শতাংশ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োগে ০.৯ শতাংশ, ফৌজদারি বিচারে ০.৭ শতাংশ এবং দুর্নীতির অনুপস্থিতিতে ০.২ শতাংশ অবনতি রেকর্ড করা হয়েছে। বিপরীতে সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতায় ২.৩ শতাংশ এবং আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায় ০.৬ শতাংশ উন্নতি হয়েছে।
এই অবনতির কারণ নিয়ে মানবাধিকার কর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া আংশিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেন, তাঁরা আশা করেছিলেন নির্বাচিত সরকার পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটাতে পারবে, কারণ অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলার ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে বা ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছিল।
তাঁর মতে, নির্বাচিত সরকার একযোগে পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। এর সঙ্গে যুক্ত চাপের কারণে কিছুটা অস্থিতিশীলতাও তৈরি হয়েছে। জ্যোতির্ময় বড়ুয়া আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা বিচারব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এসব ক্ষেত্রে দেশের সামগ্রিক পারফরম্যান্সের অবনতি হয়েছে।
আঞ্চলিক তুলনায়ও বাংলাদেশ পিছিয়ে। দক্ষিণ এশিয়ায় আবারও শীর্ষে উঠে এসেছে নেপাল। দেশটির স্কোর ০.৫২ এবং বৈশ্বিক অবস্থান ৭১তম। এরপর রয়েছে শ্রীলঙ্কা (৭৪তম) ও ভারত (৮৮তম)। এই অঞ্চলে বাংলাদেশের পেছনে আছে কেবল পাকিস্তান (১৩১তম) ও আফগানিস্তান (১৪২তম)। ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয় সর্বনিম্ন।
বৈশ্বিক তালিকায় এবার শীর্ষে আছে ডেনমার্ক। এরপর যৌথভাবে রয়েছে নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও লুক্সেমবার্গ। তলানিতে অবস্থান করছে ভেনেজুয়েলা। এর ঠিক আগে আছে আফগানিস্তান, হাইতি, কম্বোডিয়া ও নিকারাগুয়া।
সূচকটি তৈরি হয়েছে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্টের মধ্যে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে। এতে ১৪৩টি দেশ ও বিচারব্যবস্থার ২ লাখ ১৫ হাজারের বেশি পরিবার এবং ৩ হাজার ৪০০-এর বেশি আইনি বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া হয়েছে।
আইনের শাসনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সম্পর্কও তুলে ধরেছে সংস্থাটি। যেসব দেশের মাথাপিছু জিডিপি বৈশ্বিক গড় ১৪ হাজার ৪০৬ ডলারের ওপরে, সূচকে তাদের স্কোর অন্তত ০.৬৮। আর যেসব দেশের মূল্যস্ফীতি বৈশ্বিক মধ্যমা ৩.২৩ শতাংশের নিচে, তাদের স্কোর অন্তত ০.৬০। এ থেকে বোঝা যায়, আইনের শাসন ও মূল্যস্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।
সব মিলিয়ে সূচকের বার্তা দ্বিমুখী। অল্প হলেও অগ্রগতি হয়েছে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি এগিয়েছে। কিন্তু মৌলিক অধিকার ও দেওয়ানি বিচারের মতো নাগরিকের দৈনন্দিন ন্যায়বিচারের জায়গায় দুর্বলতা গভীর। পাঁচ বছরের ধারাবাহিক অবনতিও বলছে, সামান্য স্কোর বৃদ্ধি দিয়ে কাঠামোগত সংকট ঢাকা পড়ছে না।

