আবাসিক গ্রাহকের গ্যাস বিল প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনতে পারে, এমন প্রি-পেইড মিটার বসানোর বড় উদ্যোগ থেকে সরে আসছে সরকার। প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার তিনটি প্রকল্প অসমাপ্ত অবস্থাতেই গুটিয়ে ফেলার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে। আগেই প্রকল্পগুলো বাতিলের সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা কমিশন।
গ্যাস সংকট, বিদেশি ঋণের উচ্চ সুদ এবং আবাসিক খাতে নতুন সংযোগে সরকারের অনাগ্রহকে এর কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। ফলে মিটারবিহীন প্রায় ২৯ লাখ আবাসিক গ্রাহকের ব্যবহারভিত্তিক বিল দেওয়ার সুযোগ আপাতত অনিশ্চিত হয়ে পড়ল।
প্রায় পাঁচ বছর আগে আবাসিক গ্যাসের অপচয় রোধ, গ্রাহকের সচেতনতা বাড়ানো এবং সিস্টেম লস ও বকেয়া আদায়ের জটিলতা কমাতে প্রি-পেইড মিটার বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে দুটি বিতরণ কোম্পানির আওতায় ১৮ লাখ ৭০ হাজার মিটার স্থাপনের জন্য তিনটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির দুটি প্রকল্পে লক্ষ্য ছিল ১৭ লাখ ৫০ হাজার মিটার। পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানির একটি প্রকল্পে লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ২০ হাজার মিটার।
অর্থায়নের জন্য ২০২৩ সালের নভেম্বরে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ৩০ কোটি ডলার এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে ২০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি করে। বাকি অর্থ দেওয়ার কথা ছিল সরকার ও সংশ্লিষ্ট গ্যাস কোম্পানির। কিন্তু গ্রাহকের খরচ কমানো এবং অপচয় ও সিস্টেম লস কমানোর যে লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পগুলো শুরু হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের আগেই থমকে গেছে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, আবাসিক গ্রাহকের আঙিনায় মিটার বসিয়ে বিনিয়োগের অর্থ তুলে আনতে দীর্ঘ সময় লাগবে। এর মধ্যে আবাসিক খাতে নতুন সংযোগ দিতে সরকারের আগ্রহ কম। বরং শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বিপুল ঋণ নিয়ে মিটার বসানোর পরও পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে গ্রাহকের অসন্তোষ বাড়তে পারে বলেও তাঁরা মনে করেন।
আরও একটি বিষয় এখানে প্রভাব ফেলেছে। আগে বসানো মিটারের ত্রুটি এবং রিচার্জসংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে নতুন করে বড় পরিসরে প্রি-পেইড মিটার বসাতে আগ্রহ হারিয়েছে বিতরণ কোম্পানিগুলো।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পেট্রোবাংলার এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পগুলো অসমাপ্ত অবস্থায় সমাপ্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ বিষয়ে প্রস্তাব জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, গ্রাহকের অসন্তুষ্টি, গ্যাস সংকট ও ঋণের অর্থ ফেরতের বিষয়সহ নানা কারণে সরকার আর প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে চায় না।
তিতাসের ১১ লাখ আবাসিক গ্রাহকের জন্য স্মার্ট প্রি-পেইড মিটার বসানোর প্রকল্পে অর্থায়নের কথা ছিল বিশ্বব্যাংক, সরকার ও তিতাসের। ঢাকা, গাজীপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে বাস্তবায়নের জন্য এর ব্যয় ধরা হয় ৩ হাজার ৫৪২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। ২০২৩ সালের অক্টোবরে একনেক সভায় অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। সর্বশেষ হিসাবে এর আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ০.৭ শতাংশ এবং বাস্তবায়ন অগ্রগতি ০.৩৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে এর জন্য ৩০০ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ ছিল। তবে গত ১৩ সেপ্টেম্বর প্রকল্পটি অসমাপ্ত অবস্থায় সমাপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তিতাসের দ্বিতীয় প্রকল্পে ঢাকা মহানগরের দক্ষিণাঞ্চল ও নারায়ণগঞ্জের গ্রাহকদের জন্য সাড়ে ৬ লাখ স্মার্ট প্রি-পেইড মিটার বসানোর পরিকল্পনা ছিল। এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ২১৪ কোটি টাকা, অর্থায়নে থাকার কথা ছিল এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, সরকার ও তিতাসের। ২০২৩ সালের অক্টোবরে অনুমোদিত প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর। বাস্তবায়ন হলে আবাসিক গ্যাসের অপচয় রোধ, গ্রাহকের সচেতনতা বৃদ্ধি, সিস্টেম লস ও বকেয়া আদায়ের জটিলতা কমা এবং তিতাসের পরিচালন ব্যয় হ্রাসের আশা ছিল। তিতাস সূত্রে জানা গেছে, এর আর্থিক অগ্রগতি ০.১৩ শতাংশ ও বাস্তবায়ন অগ্রগতি ০.৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ১৭৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এ প্রকল্পও অসমাপ্ত অবস্থায় শেষ করার প্রস্তাব জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে।
তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ বলেন, গ্যাস সংকট ও উচ্চ সুদের ঋণ বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্প দুটি বাতিল করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঋণচুক্তি হলেও মিটার কেনা বা প্রকল্পের কোনো দরপত্র হয়নি, তাই ঋণের অর্থ এখনো খরচ হয়নি। প্রকল্প অসমাপ্ত রেখে শেষ করতে সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হচ্ছে।
তৃতীয় প্রকল্পটি পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানির। এতে ১ লাখ ২০ হাজার আবাসিক গ্রাহকের জন্য স্মার্ট প্রি-পেইড মিটারের পাশাপাশি স্কাডা ও ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ২০২৩ সালের অক্টোবরে। ব্যয় ধরা হয় ৬৮১ কোটি টাকা, যার বড় অংশ আসার কথা ছিল বিশ্বব্যাংকের ঋণ থেকে। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি ০.৯৬ শতাংশ এবং বাস্তবায়ন অগ্রগতি ০.৯৫ শতাংশ। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে এর জন্য ২২০ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। এটিও অসমাপ্ত অবস্থায় সমাপ্ত করার প্রস্তাব জ্বালানি বিভাগে পাঠানো হয়েছে।
বিদ্যুতের প্রি-পেইড মিটার নিয়ে গ্রাহকের তীব্র অসন্তোষ থাকলেও গ্যাসের ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন। তিতাসের কয়েকজন প্রি-পেইড গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিটারবিহীন গ্রাহককে গ্যাস ব্যবহার না করলেও প্রতি মাসে নির্দিষ্ট হারে বিল দিতে হয়। আর প্রি-পেইড মিটারে বিল হয় প্রকৃত ব্যবহার অনুযায়ী। ফলে মিটারবিহীন গ্রাহকের তুলনায় প্রি-পেইড গ্রাহকের খরচ অর্ধেকে নেমে আসে।
দেশের ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির আওতায় আবাসিক গ্রাহক প্রায় ৩৬ লাখ। এর মধ্যে প্রি-পেইড মিটার ব্যবহার করেন প্রায় ৭ লাখ। বাকি ২৯ লাখ গ্রাহক এখনো নির্দিষ্ট হারের বিলের আওতায়। এই পরিকল্পনা ছিল তাঁদেরই মিটারের আওতায় আনার। প্রকল্প বাতিল হলে এই বিশাল অংশের গ্রাহক ব্যবহারভিত্তিক বিলের সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকবেন।
এখানে একটি স্ববিরোধিতাও চোখে পড়ে। একদিকে গ্যাস সংকট সামলাতে অপচয় কমানোর কথা বলা হয়, অন্যদিকে অপচয় রোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত মিটার বসানো থেকেই সরে আসা হচ্ছে। নির্দিষ্ট হারে বিল দিলে গ্রাহকের ব্যবহার কমানোর কোনো আর্থিক প্রণোদনা থাকে না, ফলে অপচয়ের ঝুঁকিও থেকে যায়।
এদিকে আবাসিক গ্রাহকের প্রকৃত গ্যাস ব্যবহার নিরূপণে গবেষণা করছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। আগামী জানুয়ারিতে দুই চুলার সংযোগে একজন গ্রাহক গড়ে কতটুকু গ্যাস ব্যবহার করেন, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার আশা করছে সংস্থাটি। এর ভিত্তিতে আবাসিক গ্যাস ব্যবহারের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, সাধারণত প্রি-পেইড মিটার বসানোই সঠিক প্রক্রিয়া। এতে গ্রাহক বুঝতে পারেন তিনি কতটুকু গ্যাস ব্যবহার করছেন। গবেষণার ফল জানুয়ারিতে পাওয়া যাবে এবং তখনই বোঝা যাবে একজন গ্রাহক প্রকৃতপক্ষে কতটা গ্যাস ব্যবহার করেন।
ঋণের অর্থ এখনো খরচ না হওয়ায় অপ্রয়োজনীয় সুদের বোঝা সীমিত থাকার সম্ভাবনা আছে, এটি প্রকল্প গুটিয়ে ফেলার পক্ষে একটি যুক্তি। অন্যদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধানই মিটারকে সঠিক পথ বলছেন, আর গবেষণার ফলও এখনো আসেনি। ফলে ফল প্রকাশের আগেই প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত তাড়াহুড়ো হয়ে গেল কি না, সেই প্রশ্ন উঠতে পারে।
মিটারের ত্রুটি ও রিচার্জ জটিলতার যে অভিযোগ আছে, তার সমাধান না করে পুরো উদ্যোগ থেকে সরে আসা সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি বহাল থাকলেও আবাসিক গ্রাহকের ন্যায্য বিলের বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। জ্বালানি বিভাগ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী নেয় এবং বিকল্প কোনো মিটারিং পরিকল্পনা আসে কি না, সেদিকেই তাকিয়ে আছেন সংশ্লিষ্টরা।

