সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় নিহত বাংলাদেশি কর্মী মো. শাহেদ আহম্মেদের মরদেহ দেশে পৌঁছেছে। শুক্রবার সকাল আটটার পর মরদেহ ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসে। এ সময় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
তিনি জানান, সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরের কারাগারে প্রায় সাড়ে সাত হাজার বাংলাদেশি বন্দী আছেন। একই সঙ্গে দেশটিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে রায়ের অনুলিপি চেয়ে চিঠি দিয়েছে সরকার।
মরদেহ পৌঁছানোর পর শাহেদের স্ত্রী কহিনুর আক্তার কাকলীর হাতে মরদেহ ও সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা তুলে দেওয়া হয়। শাহেদের বাড়ি বগুড়ার শাহজাহানপুর উপজেলার মাদলা গ্রামে। বাবা মো. রফিকুল ইসলাম ও মা শাহেরা বেগম।
শাহেদ সৌদি আরবের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জেদ্দা প্রকল্পে প্লাম্বার হিসেবে কাজ করতেন। দেশটিতে তাঁর বৈধ কাজের অনুমতিপত্র (ইকামা) ছিল। ভাইয়ের মৃত্যুর পর ছুটিতে দেশে এসেছিলেন তিনি। ছুটি শেষে রিয়াদ হয়ে জেদ্দায় কর্মস্থলে ফেরার পথে গত ১০ অক্টোবর রিয়াদ বিমানবন্দরে সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের হামলায় নিহত হন। ওই হামলায় আরও একজন বাংলাদেশি, কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার বদরপুর গ্রামের মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরি নিহত হন। আহত হন আরও ২৪ বাংলাদেশি। এ তথ্য সে সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল।
প্রতিমন্ত্রী জানান, গত ছয় মাসে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে নিহত ১১ বাংলাদেশির মরদেহ দেশে আনা হয়েছে, শাহেদ তাঁদের ১১তম। গত এক মাসে সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তিনজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তাঁদের একজনের মরদেহ আজ এসেছে, বাকিদের মরদেহও দ্রুত আনার চেষ্টা চলছে। সৌদি আরবে ৪০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কাজ করেন। তাই দেশটিতে যুদ্ধ বা কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বাংলাদেশি কর্মীদের হতাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, সরকার চায় না ভবিষ্যতে আর কোনো বাংলাদেশিকে এভাবে প্রাণ হারাতে হোক। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধ হোক, এই প্রত্যাশাও জানান তিনি।
মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বাংলাদেশ সৌদি রাষ্ট্রদূতকে ডেকে কথা বলেছে। সৌদি সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে রায়ের অনুলিপি চাওয়া হয়েছে। সেটি পাওয়া গেলে ঘটনার বিস্তারিত জানা যাবে। ওই দুজনের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। তিনি জানান, সৌদি সরকার বিভিন্ন সময়ে দণ্ডিত ও কারাবন্দীদের তালিকা পাঠায়। ওই তালিকায় এই দুজনের নাম আছে কি না, তা সরকার খতিয়ে দেখছে।
তাঁর মতে, প্রতিটি দেশের নিজস্ব আইনি কাঠামো ও বিচারব্যবস্থা আছে এবং অন্য দেশের বিচারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ বাংলাদেশের উদ্দেশ্য নয়। তবে কোনো বাংলাদেশি বিদেশে দণ্ডিত হলে বা তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা জরুরি। এ ধরনের তথ্য পেলে কূটনৈতিক মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়, সাজা মওকুফের সুযোগ আছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একা এসব বিষয় সামলায় না। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং আইনি বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগ একসঙ্গে কাজ করে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বাংলাদেশে আটকে পড়া প্রবাসী কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো ও নবায়ন নিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
বিদেশের বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশন থেকে প্রবাসীরা যথাযথ সহায়তা পান না, এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি মিশনে শ্রমকল্যাণ উইং আছে, যেখানে প্রবাসীকল্যাণ বা শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কাজ করেন। প্রবাসীদের সহায়তা করা মিশন ও সরকারের দায়িত্ব। কোথাও গাফিলতি পাওয়া গেলে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মীর উপস্থিতি যেমন দেশের রেমিট্যান্সের বড় ভরসা, তেমনি সংঘাত ও আইনি জটিলতায় তাঁদের ঝুঁকিও বাড়ছে। মৃত্যুদণ্ডের রায়ের অনুলিপি হাতে এলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে। তার আগে নিহত ও আটক কর্মীদের পরিবারের উদ্বেগ কাটছে না।

