গর্ভকালীন যত্ন ও নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে পরিবারের দুই প্রজন্মকে একসূত্রে বাঁধার উদ্যোগ নিয়ে রংপুরে অনুষ্ঠিত হয়েছে বউ-শাশুড়ি মেলা। হাসি-আড্ডা, সচেতনতামূলক পালাগান ও বিনামূল্যের স্বাস্থ্যসেবার মধ্য দিয়ে মেলায় বার্তা দেওয়া হয়েছে, মা ও শিশুর সুস্বাস্থ্য রক্ষায় বউ ও শাশুড়ি পরস্পরের সহযোগী হলে পরিবারই সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে।
রংপুরে প্রতি বছর এই মেলার আয়োজন করা হয়। এবারও সেখানে জড়ো হয়েছেন বিভিন্ন এলাকার বউ ও শাশুড়ি। দুই প্রজন্মের অভিজ্ঞতা, ভালোবাসা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার গুরুত্ব তুলে ধরাই ছিল আয়োজনের মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীর যত্ন ও পুষ্টির বিষয়ে পরিবারের সবার দায়িত্ববোধ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
আয়োজকেরা জানান, মেলায় বিভিন্ন অধিদপ্তরের স্টল বসানো হয়েছিল। সেখান থেকে অন্তঃসত্ত্বা নারীরা বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ও গর্ভকালীন স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ পান। প্রসূতি ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবে উৎসাহ দিতে সচেতনতামূলক পালাগানও পরিবেশন করা হয়। গ্রামীণ জনপদে পালাগান মানুষের কাছে সহজে পৌঁছাতে পারে বলে বিষয়টি বোঝাতে এই মাধ্যম বেছে নেওয়া হয়েছে।
মেলাটির আয়োজন করেছে জননী প্রকল্প। এর সঙ্গে সমন্বয়ে রয়েছে সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর। প্রকল্পের অর্থায়ন করছে কইকা। বাস্তবায়নের দায়িত্বে আছে আরডিআরএস বাংলাদেশ, আর কারিগরি সহযোগিতা দিচ্ছে সেভ দ্য চিলড্রেন।
রংপুর আরডিআরএসের প্রকল্প সমন্বয়কারী মোহাম্মদ ফরাজদুক ভূঞা জানান, পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটি ২০২৩ সালে শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত এ ধরনের ৮২টি মেলা আয়োজন করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পের মেয়াদের মধ্যেই বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিকভাবে এ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
রংপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, মেলার মূল উদ্দেশ্য গর্ভবতী বউদের যত্ন ও পুষ্টি নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে শাশুড়িদের উদ্যোগী করে তোলা। গ্রামীণ সমাজে অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারের সিদ্ধান্তে শাশুড়ির ভূমিকা বড়। গর্ভকালে কোথায় চেকআপ হবে, কী খাওয়া হবে, প্রসব কোথায় হবে, এসব বিষয়ে তাঁর মতামত প্রভাব ফেলে। তাই শাশুড়িকে সচেতন করা গেলে গর্ভবতী নারী সঠিক সময়ে সঠিক সেবা পাওয়ার সুযোগ বেশি পান।
মেলায় অংশ নেওয়া রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার বাসিন্দা কবি ও সাহিত্যিক এসএম সাথী বেগম মনে করেন, প্রত্যন্ত এলাকায় বউ ও শাশুড়ির সম্পর্ক উন্নয়নে এ ধরনের মেলা কার্যকর ভূমিকা রাখছে। দূরবর্তী গ্রামে যেখানে স্বাস্থ্যসেবা ও তথ্যের সুযোগ সীমিত, সেখানে এমন আয়োজন মানুষকে নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করে।
বউ-শাশুড়ির সম্পর্ক নিয়ে সমাজে প্রচলিত ধারণা অনেক সময় দূরত্ব ও অবিশ্বাসের ছবি আঁকে। কিন্তু এই মেলায় সেই চিত্র বদলে সহযোগিতার দিকটি সামনে আনা হয়েছে। একসঙ্গে অংশ নেওয়া, পুরস্কার গ্রহণ ও আনন্দের মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে দুই প্রজন্মের মধ্যে আস্থা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।
নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে হলে শুধু স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সেবা বাড়ালেই চলে না, পরিবারের মনোভাবেও পরিবর্তন আনতে হয়। গর্ভবতী নারী নিয়মিত চেকআপ করাচ্ছেন কি না, পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছেন কি না, প্রসবের জন্য হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র বেছে নেওয়া হচ্ছে কি না, এসব সিদ্ধান্ত অনেকাংশে পরিবারের ওপর নির্ভর করে। সে কারণে এ ধরনের কমিউনিটিভিত্তিক উদ্যোগকে সংশ্লিষ্টরা কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পের অধীনে এখন পর্যন্ত ৮২টি মেলা হয়েছে, যা উদ্যোগটির পরিধি ও ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত দেয়। তবে এসব মেলার প্রভাব কতটা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, অর্থাৎ মেলার বার্তা পরিবারে নিয়মিত চর্চায় রূপ নিচ্ছে কি না, তা বোঝার জন্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জরুরি। মেলার সচেতনতা ঘরে ঘরে পৌঁছালেই মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

