গত ১২ বছরে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে গোসল করতে নেমে ৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সাগরে ভেসে যাওয়ার সময় জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ১ হাজার ২০০ জনকে। বেসরকারি লাইফগার্ড প্রতিষ্ঠান সি-সেফের তথ্য অনুযায়ী, শুধু চলতি বছরের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরেই পাঁচ পর্যটকের প্রাণ গেছে।
গত ২১ অক্টোবর এক দিনেই হিমছড়ি সৈকতে মারা গেছেন আরও পাঁচজন। উদ্ধারকারী ও প্রশাসনের দাবি, লাল নিশানা উড়িয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা হলেও অনেক পর্যটক তা মানছেন না। অন্যদিকে নাগরিক সংগঠন ও পর্যটকদের অভিযোগ, নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতাও কম দায়ী নয়।
সর্বশেষ ২১ অক্টোবর বিকেলে হিমছড়ির ঝুঁকিপূর্ণ সৈকতে গোসলে নামে ১২ জনের একটি পর্যটক দল। জেলা প্রশাসনের নিয়োগ করা বিচকর্মীদের সুপারভাইজার মাহবুবুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা গুপ্তখালে আটকা পড়েন এবং পাঁচজনের মৃত্যু হয়। ঘটনার পর পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ালেও গোসলে নামার ক্ষেত্রে সতর্কতা বাড়েনি বলে তিনি জানান। তাঁর তথ্য, নির্দেশনা অমান্য করে ঝুঁকি নিয়ে নেমে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫ পর্যটক বিপদে পড়ছেন। জোয়ার-ভাটা ও আবহাওয়া না জেনেই অনেকে সাগরে নামেন। স্রোতের টানে ভেসে গেলে তাঁদের বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে।

এ ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকাতে জেলা প্রশাসন পর্যটকদের জন্য ১০টি নির্দেশনা দিয়েছে। লিফলেট, বিলবোর্ড ও ডিজিটাল মাধ্যমে তার প্রচারও চলছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সাঁতার না জানলে লাইফ জ্যাকেট পরে নামতে হবে। লাল নিশানা চিহ্নিত স্থানে গোসল করা যাবে না। লাইফগার্ডের কথা মানতে হবে এবং বিকেল পাঁচটার পর সমুদ্রে নামা যাবে না। জোয়ার-ভাটা ও আবহাওয়ার অবস্থাও জেনে নিতে বলা হয়েছে। লাইফগার্ড নেই, এমন এলাকায় গোসল না করা, শিশুকে একা সমুদ্রে নামতে না দেওয়া এবং অসুস্থ বা দুর্বল শরীর নিয়ে হাঁটুপানির বেশি গভীরে না যাওয়ার কথাও নির্দেশনায় আছে। ভাসমান বস্তু নিয়ে নামার আগে বাতাসের গতি জানারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গত শুক্রবারের চিত্র দেখলে ভিড়ের ব্যাপকতা বোঝা যায়। দুপুরে সুগন্ধা পয়েন্টে অন্তত ৫০ হাজার পর্যটকের সমাগম ছিল, বিকেলে তা বেড়ে প্রায় ৯০ হাজারে পৌঁছায়। অনেকে সাগরে গোসল করছিলেন। কেউ টিউবে ভেসে ঢেউয়ের সঙ্গে খেলছিলেন, কেউ জেটস্কিতে গভীর সাগরের দিকে যাচ্ছিলেন। শিশু-কিশোরদেরও পানিতে নামতে দেখা গেছে। বেশির ভাগেরই গায়ে লাইফ জ্যাকেট ছিল না।
বালুচরে তখন একাধিক লাল নিশানা উড়ছিল। লাইফগার্ডরা বাঁশি বাজিয়ে সতর্ক করছিলেন। তাঁরা জানাচ্ছিলেন, ওই এলাকার পানির নিচে গুপ্তখাল আছে, সেখানে আটকা পড়লে বিপদ হতে পারে। তবু অনেকে সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে গোসলে ব্যস্ত ছিলেন। সুগন্ধার দক্ষিণে কলাতলী এবং উত্তরে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত আরও চার কিলোমিটার এলাকায় জড়ো হয়েছিলেন ৫০ থেকে ৬০ হাজার পর্যটক। কলাতলী থেকে লাবণী পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটারজুড়ে লাল নিশানা থাকলেও অনেকে তা আমলে নেননি।
সুগন্ধা পয়েন্টে সি-সেফের আটজন কর্মী পর্যটকদের সতর্ক করছিলেন। তিনটি ওয়াচ টাওয়ারে বসে হলুদ টি-শার্ট পরা সাতজন লাইফগার্ড নজর রাখছিলেন। ঢেউয়ের ধাক্কায় অনেক পর্যটক টিউব থেকে ছিটকে পড়ছিলেন। লাইফগার্ড ও জেলা প্রশাসনের বিচকর্মীরা দ্রুত তাঁদের তুলে আনেন।
লাইফগার্ড ও বিচকর্মীরা জানান, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কলাতলী, সুগন্ধা, সিগাল ও লাবণী—এই চার পয়েন্টের পাঁচ কিলোমিটার সৈকতে অন্তত দেড় লাখ পর্যটক গোসলে নেমেছেন। এর আগের কয়েক দিনে নেমেছেন আরও অন্তত ছয় লাখ। শুক্রবার সাগরে ভেসে যাওয়া অন্তত ৩০ জনকে উদ্ধার করা হয়। ওই দিন এসব পয়েন্টে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
হোটেল মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২১ অক্টোবর প্রতিমা বিসর্জনের দিন পর্যন্ত দুর্গাপূজার ছুটিতে কক্সবাজারে অন্তত ছয় লাখ পর্যটক এসেছিলেন। তাঁদের অধিকাংশই অন্তত একবার সাগরে নামেন। কিন্তু সৈকতের বিভিন্ন জায়গায় গুপ্তখাল ও গর্ত থাকায় তাঁরা ঝুঁকিতে পড়ছেন।
সি-সেফ লাইফগার্ডের প্রকল্প ব্যবস্থাপক ইমতিয়াজ আহমেদ এই ঝুঁকির কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, বৈরী আবহাওয়া, সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণ ও পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে সৈকতের বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেছে। এতে কলাতলী থেকে লাবণী পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটারে ১২ থেকে ১৫টি গুপ্তখাল ও বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। জোয়ারের সময় এসব পানিতে ঢাকা পড়ে যায়, ফলে পর্যটকেরা এর অবস্থান বুঝতে পারেন না। কেউ গর্তে আটকা পড়লে উদ্ধারের জন্য কোনো ডুবুরিও নেই।
ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, শহরের পাঁচ কিলোমিটার সৈকতে নিখোঁজ পর্যটকদের উদ্ধারে সি-সেফের ২৭ জন কর্মী তৎপর থাকেন। কিন্তু কলাতলী থেকে দক্ষিণে দরিয়ানগর, হিমছড়ি, ইনানী ও টেকনাফ পর্যন্ত অরক্ষিত সৈকতে কেউ নিখোঁজ হলে তাঁকে উদ্ধারের মতো কেউ নেই। অথচ এসব এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টেও পর্যটকেরা নামছেন এবং বিপদে পড়ছেন। সম্প্রতি হিমছড়িতে পাঁচজনের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে এমন একটি অরক্ষিত এলাকায়।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটিজ ফোরামের সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী অন্য দিকটি তুলে ধরেছেন। তাঁর অভিযোগ, হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক ও পর্যটন ব্যবসায়ীরা সেবার নামে আয় করতে ব্যস্ত। পর্যটকদের নিরাপত্তা, বিনোদন ও নিরাপদ গোসল নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। সৈকতের ২০০ থেকে ৫০০ মিটার এলাকা জাল দিয়ে ঘিরে ‘সুইমিং জোন’ করা যায়নি। চার যুগেও একজন ডুবুরি নিয়োগ হয়নি। আবার গোসলে নেমে কেউ মারা গেলে এর দায়ও কেউ নেন না।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, পর্যটকদের নানাভাবে সচেতন করা হচ্ছে, তবে অধিকাংশই নিয়ম মানেন না। একসঙ্গে কয়েক লাখ পর্যটক উন্মুক্ত সৈকতে নেমে পড়লে তাঁদের সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে যায়। শহরের পাঁচ কিলোমিটারের বাইরে অরক্ষিত কয়েকটি পয়েন্টে লাইফগার্ডের সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানান।
পর্যটকদের মধ্যেও এ নিয়ে ক্ষোভ ও পরামর্শ আছে। ঢাকা থেকে আসা সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, এক কিলোমিটার সৈকতে যখন ৬০-৭০ হাজার মানুষ নামেন, তখন লাল নিশানার দিকে কারও নজর যায় না। সবাই গোসলে নামতে হুড়োহুড়ি করেন। প্রাণহানি ঘটলে হুঁশ ফেরে, তত ক্ষণে আর কিছু করার থাকে না। তাঁর মতে, হোটেল-রিসোর্টে ওঠার আগেই পর্যটকদের গোসলের ঝুঁকি নিয়ে নির্দেশিকা দেওয়া গেলে কাজে আসত। পর্যটক হারুন অর রশিদ মনে করেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। হোটেলে ওঠার সময় অনলাইনে নিবন্ধন করিয়ে নিবন্ধিতদের মোবাইলে ঝুঁকির বার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা চালু হলে উপকার হতো বলে তিনি মনে করেন।
কক্সবাজারে মৃত্যুর এই ধারা শুধু পর্যটকদের অসতর্কতার ফল নয়, আবার শুধু প্রশাসনের ব্যর্থতাও নয়। দুই দিকেই ফাঁক স্পষ্ট। একদিকে লাল নিশানা, বাঁশি ও লিফলেট থাকার পরও ভিড়ের মধ্যে অনেকে সতর্কবার্তা গ্রাহ্য করছেন না, লাইফ জ্যাকেট ছাড়াই নামছেন। অন্যদিকে ছুটির সময় লাখ লাখ মানুষের চাপের তুলনায় লাইফগার্ড, ডুবুরি ও নিরাপদ গোসলের জোনের মতো অবকাঠামো একেবারেই অপ্রতুল। বিশেষ করে সম্প্রতি বর্ষণ ও ঢলে সৈকতের গড়ন বদলে যাওয়ায় গুপ্তখাল ও গর্ত নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে, যা চোখে দেখে বোঝার উপায় নেই। ফলে অভিজ্ঞ বা সতর্ক পর্যটকও বিপদে পড়তে পারেন।
শহরের বাইরের অরক্ষিত সৈকতগুলোর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। যেখানে উদ্ধারকারী নেই, সেখানে পর্যটকের যাতায়াত বন্ধ করা বা অন্তত স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা ও পাহারার ব্যবস্থা না করলে হিমছড়ির মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকেই যাবে। পর্যটকদের হোটেলে ওঠার সময় ঝুঁকির তথ্য জানানো, সীমিত পরিসরে হলেও জাল দিয়ে ঘেরা নিরাপদ জোন তৈরি, ডুবুরি নিয়োগ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপ এখন জরুরি। একই সঙ্গে দায়িত্ব নির্ধারণ না হলে এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনায় জবাবদিহিও নিশ্চিত হবে না। পর্যটন মৌসুমে আরও বেশি মানুষের আগমন ঘটবে, তাই সময় থাকতে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়াই প্রাণহানি কমানোর একমাত্র পথ।

