পিরোজপুরে দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বাদী মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মরদেহ দাফন করতে গিয়ে দিনভর বাধার মুখে পড়েছে তাঁর পরিবার। শনিবার সারা দিন নানা জায়গায় বাধা পাওয়ার পর গভীর রাতে অবশেষে দাফনের প্রস্তুতি শুরু হয়। কবর খোঁড়ার মতো লোক না পেয়ে মুঠোফোনের আলো জ্বালিয়ে নিজেরাই কবর খুঁড়তে নামেন তাঁর মেয়ে ও বোনেরা। পরিবারের অভিযোগ, দাফন নিয়ে প্রশাসনের কাছ থেকেও তাঁরা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাননি।
মানিক পশারীর বোন মোছাম্মৎ রিনা আক্তার জানান, ভাইয়ের মৃত্যুর পর তাঁরা মরদেহ দাফনের জন্য নিয়ে এলেও দাফন করতে না পেরে বিপাকে পড়েন। এখন দাফনের প্রস্তুতি হিসেবে কবর খোঁড়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মানিক পশারী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের জামাইয়ের কাছে আশ্রয় নেন। গত দুই মাস ধরে তিনি শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। শনিবার সকাল ১০টার দিকে টুঙ্গিপাড়ায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের চার নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা।
মৃত্যুর পর শনিবার দুপুরে মরদেহ পিরোজপুরে আনা হয়। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়ার জন্য মরদেহ সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে নেওয়া হলে সেখানে স্থানীয় জামায়াতের নেতা-কর্মীরা জড়ো হন। স্থানীয় সূত্র জানায়, এরপর গার্ড অব অনার ও দাফন নিয়ে বাধা তৈরি হয়।
পরিস্থিতি বিবেচনায় পুলিশি পাহারায় মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স পিরোজপুর পুলিশ লাইনে নেওয়া হয়। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সেখানে সাংবাদিকসহ অন্যদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। পরে পুলিশ ও প্রশাসন জানায়, মানিক পশারীকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে। তবে কখন ও কোথায় এই সম্মান জানানো হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
মানিক পশারীর মেয়ের জামাই ফারুক হোসেনের অভিযোগ, দুপুর ১২টার দিকে তাঁরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে গেলে গার্ড অব অনারের কথা বলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়। তাঁর দাবি, দীর্ঘ সময় সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহ রাখার পর গোপনে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে। এরপর মরদেহ কোথায় দাফন হবে, তা নিয়ে পরিবার অনিশ্চয়তায় পড়ে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের পর নিজ বাড়িতে দাফনের উদ্যোগ নিলে স্থানীয় কিছু নেতা-কর্মী ও সমর্থক আবার জড়ো হয়ে বাধা দেন। পুলিশ লাইন থেকে শংকরপাশা যাওয়ার পথের বিভিন্ন জায়গাতেও লোকজন জড়ো হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আবদুর রাজ্জাক বলেন, মানিক পশারী ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাই তাঁকে কোনোভাবেই গার্ড অব অনার দিতে দেওয়া হবে না। তাঁর ভাষ্য, পিরোজপুরের মাটিতে মরদেহ দাফন করতে দেওয়া হবে না।
পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, মানিক পশারীকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইফতেখারুল ইসলাম শামীমও জানান, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে।
মানিক পশারী ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট পিরোজপুর থানায় দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা করেন। পরে মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর বিরুদ্ধে চলা মূল মামলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
ঘটনাটি কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এনেছে। যাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিদায় জানানোর কথা, তাঁর মরদেহ কেন দীর্ঘ সময় অ্যাম্বুলেন্সে থাকল, গার্ড অব অনার কেন সবার অগোচরে দিতে হলো এবং পরিবার কেন প্রশাসনের সহায়তা পেল না, এসব প্রশ্নের স্পষ্ট ব্যাখ্যা এখনো মেলেনি। অন্যদিকে মৃত ব্যক্তির দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ গুরুতর। রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত মতভেদ যা-ই থাকুক, মৃত মানুষের দাফন নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকারের বিষয়। মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন থাকলে তা যাচাইয়ের নির্দিষ্ট আইনি ও প্রশাসনিক পথ আছে। সেই পথের বদলে মরদেহ আটকে দেওয়ার চেষ্টা আইনশৃঙ্খলার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও জবাবদিহি জরুরি। বাধার আশঙ্কা থাকলে আগেভাগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিবারকে দ্রুত দাফনের ব্যবস্থা করে দেওয়া ছিল প্রত্যাশিত। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হলে বাধাদানকারী ও দায়িত্বে অবহেলাকারীদের পরিচয় এবং প্রকৃত ঘটনা সামনে আসবে। এ ঘটনায় অভিযুক্তদের বক্তব্য ও প্রশাসনের ব্যাখ্যা আরও বিস্তারিতভাবে জানা প্রয়োজন।
সূত্র: কাল বেলা

