সৌদি আরবে বসবাসরত ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে বিশেষ পাসপোর্ট দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এরই মধ্যে ২৪ হাজার ৩০০ জনের পাসপোর্ট সৌদি আরবে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বাকি পাসপোর্ট চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এসব পাসপোর্ট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পাঠানো হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে গত ২৩ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সর্বশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বাকি পাসপোর্ট বিতরণের বিষয়ে আলোচনা চূড়ান্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে ২৪ হাজারের বেশি পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে। বাকি পাসপোর্ট দেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে।
তবে এই পাসপোর্টকে বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকদের পাসপোর্টের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই। জিয়াউদ্দিন আহমেদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এটি মূলত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করার বিশেষ নথি। এই পাসপোর্ট দিয়ে তাঁরা বাংলাদেশে ফেরার অধিকার পাবেন না, একইভাবে এর মাধ্যমে সৌদি আরবের নাগরিকত্বও অর্জিত হবে না।
কেন বিশেষ পাসপোর্টের প্রয়োজন হলো
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতে অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশের হাতে লেখা পাসপোর্ট নিয়ে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। সময়ের সঙ্গে এসব পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এরপর সৌদি কর্তৃপক্ষ সেগুলো নবায়নের বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। পরে পাসপোর্ট দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে বাংলাদেশের একাধিক স্বার্থ জড়িত। শুরুতে সরকার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও সৌদি আরবের শ্রমবাজারে সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাবসহ বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নিয়ে শেষ পর্যন্ত পাসপোর্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বাংলাদেশের জন্য সৌদি আরব একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। সেখানে কর্মরত বাংলাদেশি নাগরিকদের কর্মসংস্থান ও অভিবাসনসংক্রান্ত স্বার্থও দুই দেশের সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত। ফলে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরিচয়সংক্রান্ত এই জটিলতা সমাধানের বিষয়টি কেবল পাসপোর্ট নবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে বৃহত্তর কূটনৈতিক ও শ্রমবাজারের স্বার্থও যুক্ত রয়েছে।
সৌদি রাষ্ট্রদূতের আলোচনায় বিষয়টি গুরুত্ব পায়
বিএনপি সরকার গঠনের পর গত এপ্রিলে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ জাফর বিন আবিয়াহ।
সাক্ষাতে সৌদি আরবে বসবাসরত ৬৯ হাজার মিয়ানমারের নাগরিকের বিশেষ পাসপোর্ট ইস্যুর বিষয়টি তুলে ধরেন রাষ্ট্রদূত। তিনি প্রক্রিয়াটি দ্রুত শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখন জানিয়েছিলেন, প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ইতিমধ্যে ২২ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশের পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে। বাকি ব্যক্তিদের নথিপত্র যাচাই ও পাসপোর্ট দেওয়ার কাজ দ্রুত করতে বাংলাদেশ থেকে একটি বিশেষ দল পাঠানো হয়েছে।
যাঁদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়েছে এবং নির্ধারিত শর্ত পূরণ করেছেন, তাঁদের পাসপোর্ট দেওয়ার কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তবে এপ্রিল মাসে ২২ হাজার পাসপোর্ট দেওয়ার যে তথ্য জানানো হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে ২৪ হাজার ৩০০ পাসপোর্ট পৌঁছানোর তথ্যের সঙ্গে তার পার্থক্য মূল প্রতিবেদনের সময়ক্রম অনুযায়ী বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পরিচয় শনাক্তে থাকবে বিশেষ ব্যবস্থা
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিশেষ পাসপোর্টে পৃথক ধারাবাহিক নম্বর রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি পাসপোর্টপ্রাপকদের আঙুলের ছাপ, চোখের মণির বৈশিষ্ট্য এবং মুখমণ্ডলের ছবি জাতীয় তথ্যভান্ডারে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
এর উদ্দেশ্য হলো বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন স্থানে তাঁদের পরিচয় যাচাই সহজ করা। ভবিষ্যতে তাঁরা যাতে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করতে না পারেন, সে ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
পাসপোর্টে জাতীয়তার পরিচয়ে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ থাকবে। অর্থাৎ, এই নথি দেওয়ার মাধ্যমে তাঁদের বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না।
এখানে পরিচয় শনাক্তকরণ ও নাগরিকত্বের মধ্যে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য নথি দেওয়া এবং তাঁকে কোনো দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এক বিষয় নয়। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, এই বিশেষ পাসপোর্টের উদ্দেশ্য প্রথমটি, দ্বিতীয়টি নয়।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিতে বিষয়টি
অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ে কাজ করা আসিফ মুনীরের মতে, দীর্ঘদিন আগে বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে সৌদি আরবে যাওয়া ব্যক্তিদের নথির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ এক ধরনের জটিল পরিস্থিতিতে পড়েছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ব্যক্তির কেউ কেউ অতীতে অনিয়মের মাধ্যমে বাংলাদেশের পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণেই বাংলাদেশ শুরুতে পুরোনো পাসপোর্ট নবায়নের বিষয়ে অনাগ্রহী ছিল।
অন্যদিকে সৌদি আরবও নিজস্ব নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক প্রয়োজনের কারণে সেখানে অবস্থানরত ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করতে চায়। এ প্রেক্ষাপটে বিশেষ পাসপোর্টের মাধ্যমে তাঁদের শনাক্ত করার ব্যবস্থা দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আসিফ মুনীর মনে করেন, সৌদি আরবে বাংলাদেশের বড় শ্রমবাজার থাকায় বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে সামলানো প্রয়োজন। তাঁর ধারণা, বিশেষ পাসপোর্ট পাওয়া এসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ফিরে না এসে সৌদি আরবেই অবস্থান করবেন।
পরিচয়পত্র ইস্যুর বাইরে রয়েছে বৃহত্তর প্রশ্ন
৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে বিশেষ পাসপোর্ট দেওয়ার উদ্যোগের পেছনে পরিচয় যাচাই, পুরোনো নথির জটিলতা এবং সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কের মতো একাধিক বিষয় রয়েছে। তবে এই পদক্ষেপকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান বা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।
একদিকে সৌদি আরবে অবস্থানরত ব্যক্তিদের পরিচয়সংক্রান্ত নথি হালনাগাদ করার প্রয়োজন রয়েছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ও জাতীয় পরিচয়সংক্রান্ত বিধানও অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। তাই পাসপোর্ট ইস্যুর প্রক্রিয়ায় নথি যাচাই, বায়োমেট্রিক তথ্য সংরক্ষণ এবং স্পষ্ট পরিচয়-নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ।
বাকি পাসপোর্টগুলো ডিসেম্বরের মধ্যে বিতরণ করা গেলে দীর্ঘদিনের নথিসংক্রান্ত জটিলতা কমানোর একটি ধাপ সম্পন্ন হতে পারে। তবে এ উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্ভর করবে দুই দেশের মধ্যে সমন্বয়, পরিচয় যাচাইয়ের নির্ভুলতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনগত অবস্থান স্পষ্ট রাখার ওপর।

