কাঁচামালের সংকট ও আমদানির অনুমোদন পেতে বিলম্বের কারণে প্রায় চার মাস ধরে বন্ধ রয়েছে বাংলাদেশের একমাত্র ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সার কারখানা। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় অবস্থিত ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের উৎপাদন গত ২৮ জুন থেকে বন্ধ। প্রয়োজনীয় ফসফরিক অ্যাসিড আমদানি করা না যাওয়ায় কারখানাটির উৎপাদন কার্যক্রম এখনো শুরু করা সম্ভব হয়নি।
কৃষি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ এই সারের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ অনেকাংশে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। এমন পরিস্থিতিতে দেশের একমাত্র ডিএপি সার কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহার এবং সার সরবরাহের পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
কারখানাটির কাঁচামাল সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ৬০ হাজার টন ফসফরিক অ্যাসিড কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করেছিল। তিনটি পৃথক চালানে এই কাঁচামাল আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সর্বনিম্ন দর পাওয়া গেলেও ক্রয়প্রস্তাবটি এখনো সরকারি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের হিসাব অনুযায়ী, ৬০ হাজার টন ফসফরিক অ্যাসিড সংগ্রহে আনুমানিক ৬৪ দশমিক ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হতে পারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৮০০ কোটি টাকা।
প্রতিটি চালানে ২০ হাজার টন করে কাঁচামাল কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তিনটি চালানের জন্য সর্বনিম্ন দর পাওয়া গেছে প্রতি টনে যথাক্রমে ১ হাজার ৭৯ ডলার, ১ হাজার ৮৭ ডলার এবং ১ হাজার ৭১ দশমিক ৯০ ডলার।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে মার্চ থেকে ফসফরিক অ্যাসিডের আন্তর্জাতিক বাজারদর বেড়েছে। এ বছরের শুরুতে বাংলাদেশ প্রতি টন এই কাঁচামাল প্রায় ৭৫০ ডলারে কিনেছিল।
অর্থাৎ আগের তুলনায় কাঁচামালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে একদিকে আমদানি ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে ক্রয়প্রক্রিয়ায় বিলম্বের কারণে কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকার সময়ও দীর্ঘ হচ্ছে।
কারখানাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাইনুল হক জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরে প্রায় এক লাখ টন ডিএপি সার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু গত চার মাসে কোনো সার উৎপাদন করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, অ্যামোনিয়া সরবরাহের জন্য কারখানাটি কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড এবং চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের ওপর নির্ভর করতে পারে। কিন্তু ফসফরিক অ্যাসিড আমদানি করতে হয় দরপত্রের মাধ্যমে। এই প্রক্রিয়া বিসিআইসি পরিচালনা করে। কাঁচামাল আমদানির কাজ এখনো শেষ না হওয়ার কারণ সম্পর্কে কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে স্পষ্ট তথ্য নেই বলে তিনি জানান।
বিসিআইসির বাণিজ্য, উৎপাদন ও গবেষণা বিভাগের পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, তিনটি চালানে ৬০ হাজার টন ফসফরিক অ্যাসিড কেনার প্রস্তাব শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। এখন সেটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
ডিএপি কারখানাটি চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসেও অন্তত এক মাস গ্যাসের ঘাটতির কারণে বন্ধ ছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে বর্তমান উৎপাদন বন্ধের কারণ আলাদা। এবার প্রয়োজনীয় কাঁচামাল না থাকায় উৎপাদন শুরু করা যাচ্ছে না।
বিসিআইসির কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান জানান, দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বিবেচনায় সরকার অধিকাংশ সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা করেছে। দেশের ছয়টি বড় সার কারখানার মধ্যে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড, কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি, শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি এবং ঘোড়াশাল গ্যাস পাচ্ছিল। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, রোববার পর্যন্ত যমুনা সার কারখানাতেও গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছিল।
তবে ডিএপি কারখানার ক্ষেত্রে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও ফসফরিক অ্যাসিডের অভাবে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
কারখানা কর্তৃপক্ষের মতে, ফসফরিক অ্যাসিড আমদানির অনুমোদন পাওয়া গেলেও উৎপাদন আবার শুরু করতে আরও দেড় থেকে দুই মাস সময় লাগতে পারে। অর্থাৎ দ্রুত অনুমোদন পাওয়া গেলেও কাঁচামাল সংগ্রহ, পরিবহন এবং উৎপাদন প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে বাড়তি সময় প্রয়োজন হবে।
কারখানাটিতে সাধারণত প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টন ডিএপি সার উৎপাদিত হয়। এ জন্য আমদানি করা ফসফরিক অ্যাসিডের পাশাপাশি কর্ণফুলী ও চিটাগাং ইউরিয়া সার কারখানা থেকে সরবরাহ করা অ্যামোনিয়া ব্যবহার করা হয়।
কারখানাটিতে দুটি উৎপাদন ইউনিট রয়েছে, যেগুলোর সম্মিলিত উৎপাদনক্ষমতা দৈনিক ৮০০ টন। ফলে উৎপাদন পুনরায় শুরু হলে দেশের অভ্যন্তরীণ সার সরবরাহে কারখানাটি ভূমিকা রাখতে পারবে। তবে অনুমোদন ও কাঁচামাল সংগ্রহে বিলম্ব চলতে থাকলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে।
দেশের কৃষিতে নাইট্রোজেন ও ফসফরাসসমৃদ্ধ সার সরবরাহের উদ্দেশ্যে ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করা হয়। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের অধীনে থাকা কারখানাটি ২০০৬ সাল থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন চালিয়ে আসছে।
কিন্তু দেশের ডিএপি সারের চাহিদার বড় অংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। বিসিআইসি ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ডিএপি সারের চাহিদা প্রায় ১৫ লাখ ৭ হাজার টন। এর বিপরীতে আমদানি করা হয় প্রায় ১৪ লাখ টন।
এই হিসাব থেকে বোঝা যায়, দেশের একমাত্র ডিএপি সার কারখানার উৎপাদনক্ষমতা থাকলেও জাতীয় চাহিদা পূরণে আমদানির ওপর নির্ভরতা অনেক বেশি। ফলে স্থানীয় কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকলে আমদানির প্রয়োজনীয়তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ডিএপি কারখানার দীর্ঘস্থায়ী বন্ধ অবস্থা শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সমস্যা নয়; এটি সার সরবরাহ পরিকল্পনা এবং সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
কাঁচামাল আমদানির অনুমোদন, আন্তর্জাতিক দরপত্র, সরবরাহ এবং উৎপাদন প্রস্তুতির প্রতিটি ধাপে সময়মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে যে কারখানা দেশের কৃষি খাতে প্রয়োজনীয় সার উৎপাদনের জন্য স্থাপন করা হয়েছে, সেটির কাঁচামাল সংগ্রহে দীর্ঘসূত্রতা থাকলে উৎপাদনক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয় না।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দ্রুত ক্রয়প্রস্তাবের নিষ্পত্তি, কাঁচামাল আমদানির সময়সূচি নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট এড়াতে আগাম সরবরাহ পরিকল্পনা তৈরি করা। এতে উৎপাদন বন্ধ থাকার সময় কমানো এবং দেশের সার সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও নির্ভরযোগ্য করার সুযোগ তৈরি হবে।

