জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য সংশোধনের জন্য নির্বাচন কমিশনে জমা পড়া ১ লাখ ১৭ হাজার ৬৬৬টি আবেদন এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। গত ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, এসব আবেদনের প্রায় ৯২ শতাংশই চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অপেক্ষমাণ আবেদনের মধ্যে ৬৯ হাজার ২৫২টি ‘ঘ’ শ্রেণির। এ ধরনের আবেদনে জন্মতারিখ, বয়স, বাবা-মায়ের নামসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত তথ্য সংশোধনের প্রয়োজন হয়। এসব আবেদনের অনুমোদন দিতে হয় নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালককে।
এনআইডির তথ্য সংশোধনের আবেদন ছয়টি শ্রেণিতে ভাগ করে বিবেচনা করে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে ‘ক’ শ্রেণিতে নামের বানানসহ ছোটখাটো সংশোধন, ‘খ’ শ্রেণিতে ছবি, স্বাক্ষর ও অন্যান্য তথ্য পরিবর্তন এবং ‘গ’ শ্রেণিতে নাম বা বাবা-মায়ের নামের বড় ধরনের পরিবর্তনের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকে। ‘ঘ’ শ্রেণিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত তথ্য সংশোধনের আবেদন বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে ‘ক-১’ ও ‘খ-১’ শ্রেণিতে ছোটখাটো সংশোধন ও বানানসংক্রান্ত আবেদন রাখা হয়।
১৮ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘ঘ’ শ্রেণির আবেদনই মোট অপেক্ষমাণ আবেদনের প্রায় ৫৯ শতাংশ। এই শ্রেণিতে আগে ১ লাখ ৮ হাজার ২২৫টি আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। সব শ্রেণি মিলিয়ে নির্বাচন কমিশন এ পর্যন্ত ৬৪ লাখ ৩৫ হাজার ৩৯৭টি সংশোধনের আবেদন নিষ্পত্তি করেছে।
অপেক্ষমাণ আবেদনের সংখ্যায় ‘ঘ’ শ্রেণির পর রয়েছে ‘খ’ শ্রেণি, যেখানে ১৭ হাজার ৬৮১টি আবেদন জমে আছে। এ ছাড়া ‘গ’ শ্রেণিতে ১৫ হাজার ৪২২টি, ‘ক’ শ্রেণিতে ১১ হাজার ১৯১টি, ‘খ-১’ শ্রেণিতে ৩ হাজার ১৯২টি এবং ‘ক-১’ শ্রেণিতে ৯২৮টি আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
নিষ্পত্তি হওয়া আবেদনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ‘ক’ শ্রেণির। এ শ্রেণিতে ৪২ লাখ ১৩ হাজার ৩৯০টি আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে। ‘খ’ শ্রেণিতে নিষ্পত্তি হয়েছে ১২ লাখ ৫৬ হাজার ৪০টি এবং ‘গ’ শ্রেণিতে ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৭৪৬টি আবেদন।
আবেদনের সময় বিবেচনায় দেখা যায়, অপেক্ষমাণ ১ লাখ ১৭ হাজার ৬৬৬টি আবেদনের মধ্যে ১ লাখ ৮ হাজার ১৮৮টি চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে জমা পড়েছে। এ ছাড়া ২০২৫ সালের ৯ হাজার ২৫টি, ২০২৪ সালের ১৭১টি এবং ২০২৩ সাল বা তার আগের ২৮২টি আবেদন এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে ‘ঘ’ শ্রেণির সবচেয়ে বেশি আবেদন অপেক্ষমাণ রয়েছে ঢাকায়, ১০ হাজার ৬১৫টি। চট্টগ্রামে এ সংখ্যা ১০ হাজার ৫৫৯ এবং ময়মনসিংহে ৮ হাজার ৩৩২টি। এ শ্রেণিতে সবচেয়ে কম আবেদন রয়েছে বরিশালে।
জটিলতার কারণে ‘ঘ’ শ্রেণির আবেদনকে অনেক সময় ‘আইসিইউ’ শ্রেণি বলা হয়। এ ধরনের আবেদন জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালকের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়। অন্য শ্রেণির আবেদন বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচন কর্মকর্তারা যাচাই-বাছাই করেন।
আবেদন জমে থাকার বিষয়ে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক আবুল হাসনাত মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা বলেন, প্রতিটি আবেদনের পেছনে আলাদা ঘটনা রয়েছে। অনেক আবেদনেই ব্যক্তিগত তথ্যের মৌলিক পরিবর্তন চাওয়া হয়। তাঁর মতে, এসব আবেদনের একটি বড় অংশের পেছনে অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তারপরও আবেদনগুলো নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে।
এদিকে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী আবদুল্লাহ আল আমিন তাঁর বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রে স্থায়ী ঠিকানা সংশোধন করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়েন। আবেদন জমা দেওয়ার পর সংশোধন সম্পন্ন হতে এক মাস পাঁচ দিন সময় লাগে। এ জন্য তাঁকে সবুজবাগ নির্বাচন কার্যালয়ে দুবার যেতে হয়েছিল।
আল আমিন জানান, আবেদনের দীর্ঘ সময় কোনো অগ্রগতি হয়নি, কারণ সেগুলো কোন শ্রেণিতে পড়বে তা নির্ধারণ করা হয়নি। পরে ব্যক্তিগত পরিচিতির মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি দ্রুত করার ব্যবস্থা করেন এবং শেষ পর্যন্ত সংশোধন সম্পন্ন হয়।
নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ জানান, তাঁর কাছে জমা পড়া প্রতি পাঁচটি সংশোধন আবেদনের চারটিই ‘ঘ’ শ্রেণির। এসব আবেদনে ব্যক্তিগত তথ্যের মৌলিক পরিবর্তন চাওয়া হয় এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই করতে গিয়ে অনেক সময় জটিলতা তৈরি হয়।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কিছু আবেদনে সংশোধিত তথ্য অনুযায়ী বাবার মৃত্যুর দেড় বছর পর সন্তানের জন্ম হয়েছে বলে দেখা যায়। এ ধরনের অসংগতির কারণে তথ্য যাচাই ও সংশোধনের প্রক্রিয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে নিবন্ধিত ভোটার ১২ কোটি ৮৩ লাখ ২৩ হাজার ২৪০ জন। তাঁদের মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৫২ লাখ ১২ হাজার ৭৩১ জন, নারী ৬ কোটি ৩১ লাখ ৯ হাজার ২৬৬ জন এবং হিজড়া ভোটার ১ হাজার ২৪৩ জন।

