বহর সম্প্রসারণ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পরামর্শক নিয়োগে দরপত্র জমা দেওয়ার জন্য মাত্র আট দিন সময় দিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এত অল্প সময়ে মানসম্পন্ন প্রস্তাব জমা পড়বে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিমান ও ক্রয়প্রক্রিয়াসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। বিমান বলছে, সরকারের উচ্চপর্যায়ের সময়সূচির সঙ্গে সমন্বয় রাখতেই সময়সীমা সংক্ষিপ্ত রাখা হয়েছে।
বিমান গত ২৫ অক্টোবর প্রস্তাব আহ্বান (আরএফপি) করেছে। প্রস্তাব জমা দেওয়ার শেষ সময় আগামী ২ নভেম্বর। আগামী ৮ নভেম্বরের মধ্যে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে কাজ শুরুর লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। সম্প্রতি বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি এবং এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি, মোট ৩৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে সংস্থাটি। নির্বাচিত পরামর্শক এই ৩৫টি উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করা, রুটগুলোকে আরও লাভজনক করা, পুরোনো উড়োজাহাজ অবসরে পাঠানো এবং কেনার অর্থায়ন নিয়ে পরামর্শ দেবেন।
কাজের পরিধি বেশ বড়। পরামর্শককে উড়োজাহাজ সরবরাহের সময়সূচি ও চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা পর্যালোচনা করতে হবে। ৩৫টি উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি পূরণে বিমানের কত অর্থ লাগবে, তা নিরূপণ করতে হবে। বর্তমান বহরের ১৯টি উড়োজাহাজের মধ্যে কোনগুলো কখন অবসরে পাঠানো উচিত, সেটিও দেখতে হবে। এর সঙ্গে থাকবে সক্ষমতার ঘাটতি চিহ্নিত করা এবং যাত্রী চাহিদা, রুটভিত্তিক আয় ও পরিচালন ব্যয়ের মূল্যায়ন। অর্থায়নের ক্ষেত্রে রপ্তানি ঋণ ব্যবস্থা, বাণিজ্যিক ঋণ, উড়োজাহাজ সরবরাহের আগে অগ্রিম অর্থ পরিশোধ এবং সম্ভাব্য বিক্রয়-ও-লিজব্যাক চুক্তিও পর্যালোচনা করতে হবে। পাশাপাশি রুট পরিকল্পনা, নেটওয়ার্ক সিমুলেশন ও বহর পরিচালন ব্যয় নিরূপণে ব্যবহারের সফটওয়্যার মডেল সম্পর্কেও ব্যাখ্যা দিতে হবে।
প্রস্তাব আহ্বানের শর্ত অনুযায়ী, আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে গত পাঁচ বছরে যেকোনো জাতীয় বা আঞ্চলিক পতাকাবাহী এয়ারলাইনসের জন্য একই ধরনের কাজের অভিজ্ঞতা দেখাতে হবে। বিশেষ করে রপ্তানি ঋণ অর্থায়ন এবং বিক্রয়-ও-লিজব্যাক ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। প্রকল্পের মূল নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিস্তারিত জীবনবৃত্তান্ত জমা দিতে হবে এবং জ্যেষ্ঠ অংশীদারদের সরাসরি কাজে যুক্ত থাকার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।
আর্থিক প্রস্তাবে পারিশ্রমিক, ভ্রমণ, তথ্য ব্যবহারের লাইসেন্স ও প্রশাসনিক ব্যয়সহ সব খরচ মিলিয়ে মার্কিন ডলারে একটি নির্ধারিত ফি উল্লেখ করতে হবে। পরামর্শকের কাজের তিনটি ক্ষেত্র অনুযায়ী ব্যয়ের আলাদা হিসাবও দিতে হবে, যাতে কর্মীদের নাম, কর্মদিবস, দৈনিক পারিশ্রমিকের হার ও মোট ব্যয় থাকবে। মূল্যায়নে কারিগরি ও আর্থিক অংশের অনুপাত ৭০:৩০। যোগ্য হতে কারিগরি মূল্যায়নে ১০০-এর মধ্যে অন্তত ৭৫ নম্বর পেতে হবে। কারিগরি নম্বরের ৬০ শতাংশ থাকবে দক্ষতা ও বিশেষায়িত সক্ষমতার জন্য। বাকি ৪০ শতাংশ নির্ভর করবে কাজ শেষ করার গতি এবং প্রয়োজনীয় জনবল ও সম্পদ নিয়োগের প্রতিশ্রুতির ওপর।
কাজের সময়সূচিও বেশ ঠাসা। ৮ নভেম্বর কাজ শুরু হলে আগামী ১০ ডিসেম্বর খসড়া নির্বাহী প্রতিবেদন জমা দিয়ে সরাসরি উপস্থাপন করতে হবে। চূড়ান্ত পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনের শেষ সময় ২০২৭ সালের ১৫ জানুয়ারি।
সময়সীমা নির্ধারণের কারণ নিয়ে বিমানের বক্তব্য অবশ্য খুব স্পষ্ট নয়। সংস্থাটি জানিয়েছে, সরকারের উচ্চপর্যায়ের সময়সূচির সঙ্গে সমন্বয় করতে দরপত্রের সময় সংক্ষিপ্ত রাখা হয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করা হয়নি। দ্য ডেইলি স্টারকে লিখিত জবাবে বিমান জানায়, কাজের ধরন এবং প্রযোজ্য বিধিবিধান ও পদ্ধতি বিবেচনা করেই সময় ঠিক করা হয়েছে। বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির ২০২৫ সালের ১৭ জুলাইয়ের একটি মতামতের উল্লেখ করে সংস্থাটি বলেছে, নিজস্ব তহবিল থেকে কেনাকাটায় তারা নিজেদের প্রশাসনিক ও আর্থিক বিধিবিধান অনুসরণ করে। নির্ধারিত বিধি ও প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি মেনেই পুরো প্রক্রিয়া চলছে বলে দাবি বিমানের।
বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এ যুক্তিতে সন্তুষ্ট নন। কেন্দ্রীয় ক্রয় কারিগরি ইউনিটের সাবেক মহাপরিচালক ও সাবেক সচিব মো. ফারুক হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রয়প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও দরপত্র জমার জন্য আট দিন সময় দেওয়া সম্পূর্ণ অবাস্তব।
বিমান চলাচল খাতের বিশ্লেষক ও বিমানের সাবেক পরিচালনা পর্ষদ সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলমও প্রশ্ন তুলেছেন, এই সময় যোগ্য আন্তর্জাতিক পরামর্শকদের আকৃষ্ট করতে যথেষ্ট কি না। দ্য বাংলাদেশ মনিটরের সম্পাদক ওয়াহিদুল বলেন, গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব তৈরি করতে বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞ, বহর পরিকল্পনাবিদ, আর্থিক বিশ্লেষক ও রুট অর্থনীতির বিশেষজ্ঞদের নিয়ে যোগ্য দল গঠন করতে হয়। সঙ্গে কাজের পদ্ধতি ও বিস্তারিত বাণিজ্যিক প্রস্তাবও তৈরি করতে হয়। বিমানের কার্যক্রম সম্পর্কে অপরিচিত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আট দিনে তা করা কঠিন হতে পারে বলে তাঁর মত।
তিনি সতর্ক করেন, কৌশল ঠিকমতো তৈরি না হলে কিছু উড়োজাহাজ ফ্লাইট পরিচালনার বাইরে থেকে যেতে পারে, লোকসানি রুট চালু থাকতে পারে এবং পরিচালন ব্যয় বাড়তে পারে। এতে এমন আর্থিক দায় তৈরি হতে পারে, যা সামলাতে বিমানকে হিমশিম খেতে হবে। ওয়াহিদুল স্বীকার করেন, প্রস্তাব নেওয়ার জন্য আট দিন যথেষ্ট হতে পারে, কিন্তু এত বড় কর্মসূচির জন্য সেরা পরামর্শক আকৃষ্ট করতে তা যথেষ্ট কি না, সেই প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব বিমানকে দিতে হবে।
বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ৩৫টি উড়োজাহাজ কেনা বিমানের জন্য বড় অঙ্কের আর্থিক প্রতিশ্রুতি। বর্তমান বহর মাত্র ১৯টি উড়োজাহাজের, ফলে নতুন বহরের আকার প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি হতে যাচ্ছে। এ ধরনের সম্প্রসারণে অর্থায়ন, রুট পরিকল্পনা ও পুরোনো উড়োজাহাজ অবসরের সিদ্ধান্ত ভুল হলে তার প্রভাব দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে। পরামর্শকের মান তাই পুরো পরিকল্পনার সাফল্যে ভূমিকা রাখবে। কম প্রতিযোগিতা হলে ভালো প্রস্তাব না-ও আসতে পারে। অন্যদিকে বিমানের যুক্তি, নিয়ম মেনেই প্রক্রিয়া চলছে। এখন দেখার বিষয়, কতগুলো প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব জমা দেয় এবং নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান কতটা যোগ্য হয়।

