কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ এলাকায় অবৈধ হোটেল-রিসোর্ট উচ্ছেদে যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। অভিযানের প্রথম দিন গত সোমবার উখিয়ার ইনানী সৈকত এলাকায় একটি চারতলা রিসোর্ট ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মালিকের দাবি, প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল।
কক্সবাজার শহর থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে ইনানীর নৌবাহিনীর জেটির পূর্ব পাশে অবস্থিত ভবনটি রয়েছে তারকা হোটেল রয়েল টিউলিপ ও বে ওয়াচের মাঝামাঝি জায়গায়। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) অভিযানের নেতৃত্ব দেয়। এতে অংশ নেয় জেলা প্রশাসন, পুলিশ, এসআরবি, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও আনসার বাহিনী।
সকাল ১১টার দিকে ভবনের সামনে খননযন্ত্র (এক্সক্যাভেটর) ও শ্রমিকেরা পৌঁছালে খবর ছড়িয়ে পড়ে, আশপাশের বাসিন্দারা ভিড় করেন। দুপুরে প্রথমে ভবনের নিচতলা ও দুই পাশের ১০-১২টি দোকানঘর ভাঙা হয়। এরপর চারতলা ভবনের কাচ ভেঙে মূল কাঠামোর পিলার ভাঙার কাজ শুরু হয়।
গত ১৭ অক্টোবর সকালে মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সৈকতে তিনতলা টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লেগে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার পর কউকের অনুমোদন ছাড়া সড়কের পাশে যত্রতত্র হোটেল-রিসোর্ট গড়ে ওঠার বিষয়টি আলোচনায় আসে। এরপরই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কউকের কর্মকর্তারা জানান, ভবনটি নিজ উদ্যোগে সরিয়ে নিতে মালিকপক্ষকে চারবার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাই উচ্ছেদ করা হয়েছে।
তবে ঘটনাস্থলে থাকা ভবনের মালিক শহিদুল হক এ দাবি মানেননি। তিনি বলেন, ২০১৪ সালে ইউনিয়ন পরিষদের অনুমতি নিয়ে নির্মাণ শুরু হয়। ভবনের নিচতলায় দোকান, দ্বিতীয় তলায় রেস্তোরাঁ এবং তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় পর্যটকদের জন্য কয়েকটি কক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছিল। কিছুদিনের মধ্যেই এটি উদ্বোধনের কথা ছিল। তিনি বলেন, ‘চারটি নোটিশেরই জবাব দিয়েছি। ভবন নির্মাণের কাগজপত্রও আছে, কিন্তু কেউ তা আমলে নিচ্ছে না।’
কউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভে প্রায় ২০০টি রিসোর্ট-কটেজ-রেস্তোরাঁ রয়েছে, যার বেশির ভাগই কাঠ ও বাঁশের তৈরি। এর কোনোটিরই অনুমোদন নেই। বারবার নোটিশ দেওয়ার পরও স্থাপনা না সরানোয় যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে। তার ভাষ্য, মেরিন ড্রাইভে কোনো অবৈধ স্থাপনা রাখতে দেওয়া হবে না।
তিনি আরও জানান, ২০১৬ সালে কউক প্রতিষ্ঠার পর জেলায় প্রায় ১ হাজার ৭০০টি ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে অবকাঠামো নির্মাণ নিষিদ্ধ হলেও সেখানে আড়াই হাজারের মতো স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে ২০০টির বেশি হোটেল-রিসোর্ট-কটেজ। কয়েকটি তারকা মানের প্রতিষ্ঠান ছাড়া বেশির ভাগেরই বৈধ অনুমোদন নেই।
প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে উঠে আসে, জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) সমুদ্রসৈকতের ৫০০ গজের মধ্যে এবং শহর এলাকায় পৌরসভার ৩০০ গজের মধ্যে রিসোর্ট-কটেজ নির্মাণ নিষিদ্ধ। এ কারণে মেরিন ড্রাইভের শতাধিক প্রতিষ্ঠান কউকের অনুমোদন পায়নি। তার ভাষ্য, ‘কউকের অনুমোদন না পেলে ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ একাধিক দপ্তরের অনুমতিও পাওয়া যায় না। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা কাগজপত্র যাচাই করছি, পাশাপাশি যৌথ উচ্ছেদ অভিযানও চলছে।’ যাদের কিছু কাগজ আছে, কিছু নেই, তাদের অনুমোদন দ্রুত দিতে ব্যবসায়ীরা ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের প্রস্তাব দিয়েছেন বলে জানান তিনি। প্রস্তাবটি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, অবৈধ হোটেল-রিসোর্ট আইনের আওতায় আসুক, এটা তাঁরাও চান। কারণ, টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডে পর্যটকের প্রাণহানিতে কক্সবাজারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানান, পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া চলায় সম্প্রতি ২৬টি রিসোর্ট ও ১০টি রেস্তোরাঁকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। জবাব না দেওয়ায় ১৪টি রিসোর্টকে জরিমানা করা হয়েছে এবং দুটির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ১৯৯৯ সালে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন সৈকত এলাকাকে ইসিএ ঘোষণা করে সরকার।
কক্সবাজার হোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার জানান, তাদের সমিতির সদস্যসংখ্যা ১৮৭। তালিকাভুক্ত প্রায় সব হোটেল-গেস্টহাউসের অনুমোদন আছে। বাকিগুলোর কাগজপত্র আছে কি না, তা তার জানা নেই।

