কৃষকের কাছে সহজে ও ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছে দিতে নতুন ডিলার নিয়োগ দিয়েছে সরকার। তবে এই নিয়োগপ্রক্রিয়া ঘিরে দেশের বিভিন্ন জেলায় স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নতুন ডিলারদের মধ্যে ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতা-কর্মী, তাঁদের পরিবারের সদস্য এবং কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের স্বজনদের অনেকে রয়েছেন। তাঁদের কারও কারও আগে সার বিক্রির অভিজ্ঞতাও ছিল না।
কৃষক, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, নির্ধারিত যোগ্যতা ও নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করে রাজনৈতিক পরিচয় এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের ভিত্তিতে অনেককে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও অর্থের বিনিময়ে নিয়োগের অভিযোগও উঠেছে। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, নিয়ম মেনেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। সার বিতরণ ও মজুত ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দেশজুড়ে রাজনৈতিক পরিচয় ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের প্রায় ৫ হাজার ২০০ জন এবং বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের প্রায় ৫ হাজার ৬০০ জন সার ডিলার রয়েছেন। সম্প্রতি সরকার আরও সাড়ে ৪ হাজারের বেশি ডিলার নিয়োগ দিয়েছে।
নতুন নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের একটি বড় অংশের সার ব্যবসায় পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই এবং কারও কারও নিজস্ব গুদামও নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে বিভিন্ন জেলার নিয়োগ তালিকা ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
যশোরে মনোনীত ৯৮ জন ডিলারের মধ্যে অন্তত ৬৫ জন বিএনপির নেতা-কর্মী অথবা তাঁদের নিকটাত্মীয় বলে অভিযোগ রয়েছে। চৌগাছা উপজেলায় পৌর বিএনপির সভাপতি সেলিম রেজা আউলিয়ার প্রতিষ্ঠান মেসার্স চৌগাছা ট্রেডার্স ডিলারশিপ পেয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, দলীয় প্রভাব এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
একই উপজেলার পাতিবিলা ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি জহুরুল ইসলামের স্ত্রী রহিমা আক্তার লিপি। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ইউনিয়নে সার বিক্রির অভিজ্ঞতা থাকা চারজন আবেদনকারী থাকলেও তাঁদের পরিবর্তে অভিজ্ঞতাহীন রহিমাকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
হাকিমপুর ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছে মেসার্স নিশান ট্রেডার্স। প্রতিষ্ঠানটির মালিক ষাটোর্ধ্ব আমেনা বেগম, যিনি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসানের মা। স্থানীয়দের দাবি, আমেনা বেগম বা তাঁর ছেলে আগে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।
ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়েও সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামানের পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের ডিলারশিপ পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। লংগাইর ইউনিয়নে মেসার্স এসএম এন্টারপ্রাইজের নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন তাঁর ছোট ভাই মো. মনিরুজ্জামান, যিনি দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক। উস্থি ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছেন সংসদ সদস্যের মামা মো. মনিরুজ্জামান জসিমের প্রতিষ্ঠান জাহিদুল স্যানিটারি অ্যান্ড হার্ডওয়্যার।
অভিযোগের বিষয়ে সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বাচ্চু বলেন, রাজনৈতিক ত্যাগ, ব্যবসায়িক যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং গুদামের সক্ষমতা যাচাই করেই ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
রাজশাহীতেও নতুন ডিলার নিয়োগ নিয়ে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। জেলায় নিয়োগ পাওয়া ৮৫ জনের মধ্যে একজন জামায়াতে ইসলামীর কর্মী। অন্যদের বড় অংশ বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী অথবা তাঁদের পরিবারের সদস্য বলে অভিযোগ রয়েছে।
চারঘাট, বাঘা, তানোর, পুঠিয়া, মোহনপুর ও পবা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ডিলারশিপ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে স্থানীয় বিএনপি নেতা, তাঁদের স্ত্রী, সন্তান এবং আত্মীয়স্বজন রয়েছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তাঁদের কয়েকজনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়কে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ করা হয়েছে।
বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলায় বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ মৃধার দুই ভাই আরিফ মৃধা ও সোহেল মৃধা ডিলারশিপ পেয়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, আগে সার ব্যবসার অভিজ্ঞতা না থাকলেও তাঁরা পারিবারিক পরিচয়ের কারণে এ সুবিধা পেয়েছেন।
নোয়াখালীর হাতিয়ায় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ দাউদের বিরুদ্ধে নিজের বাবাকে ডিলারশিপ পাইয়ে দিতে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে। তমরদ্দি ইউনিয়নে মেসার্স আইমান এন্টারপ্রাইজের মালিক তাঁর বাবা আব্দুল বাতেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওই কৃষি কর্মকর্তা।
কুড়িগ্রামের নয়টি উপজেলায় নতুন নিয়োগ পাওয়া ৭৫ জন ডিলারের মধ্যে ৬০ জন বিএনপির নেতা-কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্য বলে অভিযোগ রয়েছে। কুড়িগ্রাম সদরে নিয়োগ পাওয়া নয়জন ডিলারের সবাই বিএনপিসংশ্লিষ্ট বলে জানা গেছে। সাতক্ষীরায় নিয়োগ পাওয়া ৮০ জনের বড় অংশ এবং মৌলভীবাজারে অনুমোদিত ৫৮ জনের মধ্যে অন্তত ৪৫ জন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ উঠেছে।
ডিলার নিয়োগে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ
সার ডিলার নিয়োগে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও সামনে এসেছে। গত ১২ অক্টোবর ময়মনসিংহের গৌরীপুর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে মেসার্স মুন্সী এন্টারপ্রাইজের মালিক ও পৌর কৃষক দলের সভাপতি মো. গোলাম কাজীয়েল হাজাত শাহী মুন্সী অভিযোগ করেন, প্রতি ডিলার নিয়োগে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার অলিখিত লেনদেন হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, এ ঘটনায় উপজেলা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ জড়িত। তাঁর অভিযোগ, লটারিতে প্রথম স্থান অর্জন করেও তিনি ডিলারশিপ পাননি।
ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে প্রশাসনের একটি অংশের বিরুদ্ধে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা নানা ধরনের হয়রানির শিকার হবেন, অথচ অর্থের বিনিময়ে ডিলারশিপ দেওয়া হবে—এটি গ্রহণযোগ্য নয়।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের ফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
অনিয়ম হলে বাড়তে পারে সারের বাজারদর
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খানের মতে, ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের ডিলারশিপ পাওয়ার ঘটনা নিজে থেকেই অনিয়ম প্রমাণ করে না। তবে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তি কিংবা কৃষি কর্মকর্তাদের স্বজনদের নিয়োগ দেওয়া হলে তা উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, অর্থের বিনিময়ে ডিলারশিপ পাওয়া ব্যক্তিরা বিনিয়োগের টাকা তুলে আনতে সারের দাম বাড়িয়ে বিক্রির চেষ্টা করতে পারেন। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই মাঠপর্যায়ে তদারকি বাড়ানো এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
কৃষি বিভাগের দাবি, নীতিমালা মেনেই নিয়োগ
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। গত সোমবার রাতে তিনি বলেন, শতভাগ নীতিমালা অনুসরণ করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কমিটির বাছাইপ্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তাঁর মতে, এ কারণে সারা দেশে সার সরবরাহব্যবস্থায় সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে কোথাও ত্রুটি পাওয়া গেলে তদন্তের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, নিয়োগগুলো অস্থায়ী ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ডিলারশিপ বাতিল করা সম্ভব।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ডিলারশিপ পরিবর্তন করা যাবে।
অন্যদিকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, যেসব এলাকায় ডিলার নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ উঠেছে, সেখানে নিয়োগ স্থগিত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে, সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রকৃত যোগ্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে কৃষকের কাছে সঠিক সময়ে সার পৌঁছে দেওয়া নিশ্চিত করাই হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: আজকের পত্রিকা

