উচ্চ বেতনের চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে দেশটির সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে। জাতিসংঘের ইউক্রেন যুদ্ধবিষয়ক স্বাধীন তদন্ত কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতারণা ও জবরদস্তির মাধ্যমে ৩০টি দেশের নাগরিককে রুশ সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা হয়েছে।
সোমবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রতিবেদনটির তথ্য উপস্থাপন করা হয়। তবে রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে কতজন বাংলাদেশিকে নিয়োগ করা হয়েছে কিংবা দেশটির সেনাবাহিনীতে কতজন বাংলাদেশি কাজ করছেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এইভাবে নিয়োগ করা অনেক মানুষ নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন, বন্দি হয়েছেন অথবা নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের বড় একটি অংশকে বেছে নেওয়া হয়েছিল নিম্ন আয়ের ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবার থেকে।
উচ্চ বেতনের চাকরির মিথ্যা আশ্বাস
তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তাকর্মী, গাড়িচালক, নির্মাণশ্রমিক ও যন্ত্র মেরামতের কাজসহ বিভিন্ন পেশায় ভালো বেতনের চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসব মানুষকে রাশিয়ায় নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর অনেকেরই প্রতিশ্রুত চাকরি পাওয়া হয়নি। বরং তাঁদের অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে পরে রুশ সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই পুরুষ। তাঁদের বয়স ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকে তাঁদের সংগ্রহ করা হয়েছিল। এসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, নাইজেরিয়া, কেনিয়া ও শ্রীলঙ্কার নাম রয়েছে।
ভাষা না বুঝেই সেনাবাহিনীতে যোগদানের কাগজে স্বাক্ষর
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর অনেককে সেনাবাহিনীতে যোগদানের জন্য যোগাযোগের তথ্য দেওয়া হতো, যা রুশ ভাষায় লেখা ছিল। ভাষাগত বাধার কারণে অনেকে বুঝতেই পারেননি, তাঁদের সামনে কী অপেক্ষা করছে। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা না বুঝেই নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্রে স্বাক্ষর করেছেন।
যাঁরা যোগ দিতে রাজি হননি অথবা কাগজপত্রের বিষয়বস্তু বুঝতে পারেননি, তাঁদের ওপর পুলিশি হয়রানি ও কারাগারে পাঠানোর ভয় দেখিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি নির্যাতন ও হত্যার হুমকিও ব্যবহার করা হয়েছে। এর আগে ভুক্তভোগীদের পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়ার ঘটনাও তদন্তে উঠে এসেছে।
জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের অভিযোগ, মানব পাচার, অবৈধ নিয়োগ এবং অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় রাশিয়ার কর্তৃপক্ষ সরাসরি জড়িত ছিল। কমিশন রুশ সরকারকে এ ধরনের নিয়োগ অবিলম্বে বন্ধ করা, পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে।
বাংলাদেশিদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ ৮ হাজার ডলার
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশি ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে দালাল ও মধ্যস্থতাকারীরা সেবা মাশুল হিসেবে ৪০০ থেকে ৮ হাজার ডলার পর্যন্ত নিয়েছেন।
রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের মাত্র ২০ মিনিট থেকে এক মাস পর্যন্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এরপর তাঁদের দিয়ে পরিখা খনন, সেনাদের খাবার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বহন, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আহত সেনাদের উদ্ধার এবং নিহত সেনাদের মরদেহ সরিয়ে নেওয়ার মতো কাজ করানো হয়েছে। এমনকি তাঁদের সরাসরি সম্মুখযুদ্ধেও পাঠানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিছু হটার চেষ্টা করলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে রুশ পক্ষ থেকে গুলি চালানো হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিশ্রুত বেতন না দেওয়া এবং রাশিয়ার ব্যাংক হিসাবে জমা অর্থ তুলে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
দুই বছরে রাশিয়ায় গেছেন প্রায় সাড়ে আট হাজার বাংলাদেশি
ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, গত দুই বছরে বৈধ প্রক্রিয়ায় প্রায় ৮ হাজার ৫০০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছে। তবে তাঁদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এসব প্রবাসীর নিরাপত্তা ও অবস্থান সম্পর্কে দ্রুত অনুসন্ধান চালাতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সরকারি তথ্যেও গত দুই বছরে বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় কর্মসংস্থানের জন্য অন্তত ৭ হাজার ৯৪৯টি ছাড়পত্র দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, চলতি বছরের মার্চে ফোর্টিফাই রাইটস ও ট্রুথ হাউন্ডসের যৌথ তদন্তে অন্তত ১০৪ জন বাংলাদেশিকে রুশ সেনাবাহিনীতে নিয়োগের তথ্য পাওয়া যায়। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৩৪ জন নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চাকরির আশায় বিদেশে যাওয়া মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে এসব তথ্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে বৈধ কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি, নিয়োগের প্রকৃত শর্ত এবং বিদেশে পৌঁছানোর পর কর্মীদের অবস্থান যাচাই করা কতটা জরুরি, তা এই ঘটনা আবারও সামনে এনেছে।

