দেশের কারাগারগুলোতে বন্দির সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সেই তুলনায় চিকিৎসাসেবা ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা বাড়েনি। কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে কারা হেফাজতে মারা গেছেন ১ হাজার ৪১৩ জন বন্দি। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই মৃত্যু হয়েছে অন্তত ২৫১ জনের। অথচ দেশের ৭৫টি কারাগারের জন্য অনুমোদিত চিকিৎসকের পদের বিপরীতে বর্তমানে প্রেষণে কর্মরত রয়েছেন মাত্র দুজন চিকিৎসক।
চিকিৎসক, নার্স ও অ্যাম্বুলেন্সের ঘাটতি, অতিরিক্ত বন্দির চাপ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে বিলম্ব—সব মিলিয়ে কারাগারের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় একজন মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে কোনো বন্দির মৃত্যু হলে তা গুরুতর মানবাধিকার প্রশ্ন তৈরি করে।
অসুস্থতার খবর পেয়েও বাবাকে বাঁচাতে পারেননি স্বজনেরা
ঢাকার মালিবাগে একটি ব্যাংকের এটিএম বুথে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন ৫৯ বছর বয়সী রফিকুল ইসলাম। গত মার্চে নারী ও শিশু নির্যাতনের একটি মামলায় গ্রেপ্তারের পর তিনি কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিলেন।
রফিকুল আগে থেকেই ডায়াবেটিস, হৃদরোগসহ বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছিলেন। তাঁর মাথায় টিউমারের অস্ত্রোপচারসহ পাঁচ থেকে ছয়টি অস্ত্রোপচার হয়েছিল। নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধের প্রয়োজন ছিল তাঁর।
গত শনিবার হঠাৎ বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব করলে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় কারা কর্তৃপক্ষ। পরিবারের সদস্যদের দুপুর ১২টার দিকে তাঁর অসুস্থতার খবর দেওয়া হয়। কিন্তু কারারক্ষীরা তাঁকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকেরা আর তাঁকে বাঁচাতে পারেননি। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
রফিকুলের ছেলে সিরাজ হোসেনের অভিযোগ, তাঁর বাবা ঠিকমতো চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ পাননি। শরীরের অবস্থার উন্নতি হচ্ছে, নাকি অবনতি—তা বোঝার মতো নিয়মিত পর্যবেক্ষণও ছিল না বলে দাবি করেন তিনি।
পরিবারের অভিযোগ, গুরুতর অসুস্থ একজন মানুষকে হাসপাতালে নিতে কয়েক ঘণ্টা দেরি হওয়ায় তাঁর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। কারা কর্তৃপক্ষ অবশ্য মৃত্যুর কারণ হিসেবে অপমৃত্যুর মামলায় হৃদ্রোগের কথা উল্লেখ করেছে। মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্তের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
পাঁচ বছরে কোথায় কত বন্দির মৃত্যু
কারা অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কারা হেফাজতে মোট ১ হাজার ৪১৩ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৯০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বাইরের হাসপাতালে এবং ৪৯৬ জন মারা গেছেন হাসপাতালে নেওয়ার পথে। কারা হাসপাতালে মারা গেছেন মাত্র তিনজন, যাঁদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ২০২১ সালে। এ ছাড়া সাতজনের মৃত্যু আত্মহত্যা হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে।
বছরভিত্তিক হিসাবেও মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ২০২১ সালে ৩০১ জন, ২০২২ সালে ২২৩ জন, ২০২৩ সালে ৩৭৭ জন, ২০২৪ সালে ৩২১ জন এবং ২০২৫ সালে ১৮৮ জন বন্দি মারা গেছেন।
চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই কারা হেফাজতে অন্তত ২৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। কারা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব মৃত্যুর প্রধান কারণ অসুস্থতা, যার মধ্যে হৃদ্রোগ অন্যতম।
কারা উপমহাপরিদর্শক (স্বাস্থ্য) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আখতার হাসিব দেওয়ান বলেছেন, গত পাঁচ থেকে ছয় বছরে বন্দিমৃত্যুর হার মোটামুটি একই রকম রয়েছে। তবে তাঁর মতে, একটি মৃত্যুও অনাকাঙ্ক্ষিত এবং প্রতিটি ঘটনাই কর্তৃপক্ষের জন্য দুঃখজনক।
তবে মৃত্যুর সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় বাড়ল কি কমল, শুধু সেই হিসাব দিয়ে চিকিৎসাসেবার মান নির্ধারণ করা যায় না। অসুস্থ বন্দিদের কত দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, কতজন প্রয়োজনীয় ওষুধ পাচ্ছেন এবং জরুরি অবস্থায় হাসপাতালে পৌঁছাতে কত সময় লাগছে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
বিচারাধীন বন্দিদের মৃত্যু বেশি
বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের তুলনায় বিচারাধীন বন্দিদের মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। সংস্থাটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর বিশ্লেষণ করে এ বছরের প্রথম নয় মাসে ১০২ জন বন্দির মৃত্যুর তথ্য পেয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৬০ জন বিচারাধীন এবং ৪২ জন সাজাপ্রাপ্ত ছিলেন। এ সময়ে ঢাকা বিভাগে মারা গেছেন ৬৪ জন।
সংস্থাটির আগের বছরের তথ্যেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৫ সালে সংবাদপত্রে প্রকাশিত ১০৭টি মৃত্যুর ঘটনার মধ্যে ৬৯ জন ছিলেন বিচারাধীন বন্দি। ২০২৪ সালে ৬৫ জনের মধ্যে ৪২ জন, ২০২৩ সালে ১০৬ জনের মধ্যে ৬৪ জন, ২০২২ সালে ৬৫ জনের মধ্যে ৩৭ জন এবং ২০২১ সালে ৮১ জনের মধ্যে ৫২ জন ছিলেন বিচারাধীন।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, অনেক বন্দি অসুস্থ অবস্থায় কারাগারে প্রবেশ করেন। কিন্তু তাঁদের রোগের ইতিহাস, নিয়মিত ওষুধের প্রয়োজন এবং শারীরিক অবস্থার বিষয়ে যথাযথ তথ্য সংগ্রহ না করা হলে চিকিৎসা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, ডায়াবেটিসের মতো রোগে আক্রান্ত বন্দির নিয়মিত ইনসুলিন প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু কারাগারে সেই ওষুধ সরবরাহের প্রক্রিয়ায় দেরি হলে রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে পারে। হৃদ্রোগ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিশেষ ঝুঁকিতে থাকেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে কারা অধিদপ্তর সব কারাগারের জেল সুপারদের চিঠি দিয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পথে বন্দিমৃত্যুর ঘটনা বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছিল। ওই চিঠিতে এ ধরনের মৃত্যু ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
কারাগারে বন্দির সংখ্যা ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭৫টি কারাগারের মোট ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৮৬ জন। এর মধ্যে ১৫টি কেন্দ্রীয় কারাগার এবং ৬০টি জেলা কারাগার। কিন্তু বর্তমানে বন্দির সংখ্যা ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে গেছে।
২০২৪ সালের জুনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে কারাগারে বন্দি ছিলেন ৬৭ হাজার ৫৩২ জন। ওই বছরের জুলাইয়ে সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ৭৯ হাজার ৩৩৫ জনে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বন্দির সংখ্যা ছিল ৮০ হাজার ৩৪৫। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে তা ১ লাখ ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
কারা অধিদপ্তর বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গ্রেপ্তার বৃদ্ধি, রাজনৈতিক মামলায় আটক এবং আগের বন্দিদের জামিন পেতে বিলম্বের কারণে কারাগারে চাপ বাড়ছে।
কারা অধিদপ্তরের অক্টোবরের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ জন নতুন বন্দি কারাগারে আসছেন। অন্যদিকে, প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ১০০ জন জামিনে মুক্তি পাচ্ছেন। ফলে প্রতিদিন গড়ে আরও ৩০০ জন কারাগারে থেকে যাচ্ছেন। এ হিসাবে মাসে বন্দির সংখ্যা প্রায় ৯ হাজার বাড়তে পারে।
ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভাগীয় শহর এবং নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, কক্সবাজার ও কুমিল্লার কারাগারগুলোতে বন্দির চাপ সবচেয়ে বেশি বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বন্দির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় শুধু থাকার জায়গার সংকট নয়, খাবার, চিকিৎসা, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তার ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে।
৭৫ কারাগারের জন্য চিকিৎসক মাত্র দুজন
কারা অধিদপ্তরের অনুমোদিত চিকিৎসক পদের সংখ্যা ১৬২। কিন্তু বর্তমানে প্রেষণে কর্মরত রয়েছেন মাত্র দুজন চিকিৎসক। তাঁদের একজন মানিকগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে এবং অন্যজন রাজশাহী কারা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করছেন।
অন্যদিকে, দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল থেকে ৯৭ জন চিকিৎসক নির্ধারিত সময়ে কারাগারে গিয়ে প্রতিদিন প্রায় দুই ঘণ্টা করে বন্দিদের চিকিৎসাসেবা দেন। ফলে সন্ধ্যা ও রাতে কোনো বন্দি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত চিকিৎসক পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।
নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতিও প্রকট। ডিপ্লোমা নার্সের ১০১টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২৯ জন। ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ানের ১১টি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন পাঁচজন। ফার্মাসিস্টের ৭৬টি অনুমোদিত পদের মধ্যে নয়টি পদ এখনো শূন্য।
কারারক্ষীদের মধ্য থেকে ৩৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে প্রশিক্ষণ দিয়ে কোনো কোনো কারাগারে পরীক্ষাগারের কাজ চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সাড়ে ১৩ হাজারের বেশি বন্দি রয়েছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট একজন চিকিৎসক। তাঁর মতে, কারাগারটির হাসপাতালে অন্তত সাতজন চিকিৎসক প্রয়োজন হলেও সেখানে সংযুক্ত অবস্থায় মাত্র দুজন চিকিৎসা দিচ্ছেন।
তিনি আরও জানান, কারা হাসপাতালে বিশেষায়িত চিকিৎসার ব্যবস্থা সীমিত। প্রয়োজন হলে বন্দিদের বাইরের বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিছু চিকিৎসা যন্ত্রপাতি থাকলেও জনবলের অভাবে সেগুলো দিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।
নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি কারাগারে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য চিকিৎসক থাকার কথা। নারী বন্দি থাকলেও কারাগারগুলোতে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের ব্যবস্থাও নেই বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম পড়ে আছে অব্যবহৃত
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতির পাশাপাশি কারা হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার না হওয়ার বিষয়টিও উদ্বেগজনক।
কাশিমপুর-২ কেন্দ্রীয় কারাগারে ২০০ শয্যার তিনতলা হাসপাতাল ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ২০০৩ সালে এবং শেষ হয় ২০০৫ সালে। পরে অপারেশন থিয়েটারের যন্ত্রপাতি, এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফি যন্ত্রসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনা হয়। দুই ধাপে এসব সরঞ্জাম কিনতে প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছিল।
হাসপাতালটির জন্য একজন তত্ত্বাবধায়ক, দুইজন জ্যেষ্ঠ পরামর্শক, নয়জন কনিষ্ঠ পরামর্শক, ২০ জন চিকিৎসা কর্মকর্তা এবং অন্যান্য কর্মীসহ মোট ১৫০ জনের জনবল অনুমোদিত ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না হওয়ায় অনেক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যায়নি।
চট্টগ্রাম, কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার এবং খুলনার কারাগারের জন্যও বিভিন্ন সময়ে প্রায় তিন কোটি টাকার এক্স-রে, ইসিজি, এন্ডোস্কোপি ও অপারেশন থিয়েটারের সরঞ্জাম কেনা হয়েছিল। জনবল সংকটের কারণে এসব যন্ত্রপাতির বেশির ভাগই অব্যবহৃত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ১৯৯৮ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে ১০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়। পরে প্রায় এক কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হলেও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না হওয়ায় সেগুলোর ব্যবহার ব্যাহত হয়।
একইভাবে খুলনায় ২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৭০ শয্যার কারা হাসপাতাল এবং কেরানীগঞ্জে ২০০৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১৭২ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়। খুলনার হাসপাতালের জন্য প্রায় এক কোটি টাকা এবং কেরানীগঞ্জের হাসপাতালের জন্য প্রায় ৬১ লাখ টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা হয়েছিল। সেখানেও জনবলের অভাবে সরঞ্জাম ব্যবহারে সমস্যা রয়ে গেছে।
৭৫ কারাগারের জন্য অ্যাম্বুলেন্স মাত্র ২১টি
জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বাধা হলো অ্যাম্বুলেন্সের ঘাটতি। দেশের ৭৫টি কারাগারের জন্য বর্তমানে অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে মাত্র ২১টি। ফলে গুরুতর অসুস্থ বন্দিদের বাইরের হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অনেক সময় সাধারণ গাড়ি, দ্বৈত কেবিনের পিকআপ কিংবা জেল সুপারের গাড়ির ওপর নির্ভর করতে হয়।
এসব যানবাহনে রোগীর জন্য অক্সিজেন, স্যালাইন ও জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সব সময় থাকে না। হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হলে রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কারা উপমহাপরিদর্শক আখতার হাসিব দেওয়ান অ্যাম্বুলেন্সের এই ঘাটতিকে গুরুতর সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক কারাগারে কোনো অ্যাম্বুলেন্স নেই। জরুরি রোগীকে হাসপাতালে নিতে কখনো কখনো গাড়ি ভাড়া করতে হয়।
তিনি জানান, কারাগারগুলোর জন্য ৪৪টি অ্যাম্বুলেন্স কেনার প্রকল্প বাস্তবায়নের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। পাশাপাশি ৫৫ জন ডিপ্লোমা নার্স নিয়োগের প্রক্রিয়াও প্রায় শেষ হয়েছে।
তবে চিকিৎসকের ঘাটতি পূরণের ক্ষেত্রে কারা কর্তৃপক্ষের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বর্তমানে নিয়ম অনুযায়ী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রেষণে চিকিৎসক নিয়োগ করতে হয়। কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, চিকিৎসকদের পদায়নে অনাগ্রহের পেছনে রয়েছে পদোন্নতি, উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার সীমাবদ্ধতা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক মো. জাহিদ রায়হান বলেন, চিকিৎসকের সংকট থাকায় চাহিদা অনুযায়ী সব জায়গায় চিকিৎসক দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে সংশ্লিষ্ট পদ সৃষ্টি ও নিয়োগের ব্যবস্থা থাকলে নিয়ম অনুযায়ী চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে।
বন্দির চিকিৎসা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, একজন ব্যক্তি কারাগারে বন্দি থাকার অর্থ তিনি রাষ্ট্রের হেফাজতে রয়েছেন। তাই তাঁর চিকিৎসা, খাবার এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
তিনি বলেন, চিকিৎসকের অভাব, অ্যাম্বুলেন্স সংকট কিংবা হাসপাতালে নিতে দেরি হওয়ার অজুহাতে রাষ্ট্র তার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়া মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করে।
২০১৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বন্দিদের প্রতি আচরণের ন্যূনতম মানদণ্ড গ্রহণ করে, যা ‘নেলসন ম্যান্ডেলা বিধিমালা’ নামে পরিচিত। এই নীতিমালার মূল কথা হলো, বন্দিদের অমানবিক পরিবেশে রাখা বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা শাস্তির অংশ হতে পারে না। রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব।
কারাগারে বন্দির সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা ও জরুরি সেবার সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে অসুস্থ বন্দিদের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ, অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহ, অব্যবহৃত চিকিৎসা সরঞ্জাম চালু করা এবং বন্দিদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা জরুরি।
কারা কর্তৃপক্ষ জনবল ও পরিবহন সংকটের কথা স্বীকার করেছে এবং কিছু নিয়োগ ও অ্যাম্বুলেন্স কেনার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়ে বন্দিরা সময়মতো চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ কারাগারে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অর্থ শুধু বন্দিকে পাহারা দেওয়া নয়; তাঁর জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষাও নিশ্চিত করা।
সূত্র: বিডিনিউজ ২৪

