আইনের মৌলিক কথা সহজ: দোষ প্রমাণের আগে কেউ অপরাধী নন, আর শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ার আদালতের। অথচ রাস্তায়, চেকপোস্টে আর সামাজিক মাধ্যমে প্রতিদিন আরেক বিচারব্যবস্থা চলছে। সেখানে বিচারক ক্যামেরা, রায় ভাইরাল ভিডিও, আর শাস্তির নাম “সামাজিক লজ্জা”।
জরিমানার জায়গায় জনসমক্ষে অপমান
গত জুনে হাতিরঝিলের এক চেকপোস্টে হেলমেট ও লাইসেন্সবিহীন দুই তরুণী মোটরসাইকেলে ধরা পড়েন। আইনে এর শাস্তি নির্ধারিত জরিমানা। কিন্তু তাঁদের ঘিরে তখন ফোন আর বুম হাতে অনেক মানুষ। তাঁরা হাত জোড় করে অনুরোধ করলেন, একজন ওড়নায় মুখ ঢেকে সরে যেতে চাইলেন, ক্যামেরা তাঁর পিছু নিল। তাঁদের ভয় ছিল আইনের নয়, “বাসায় কী হবে” তা নিয়ে। পরদিন ভিডিও লাখো মানুষের কাছে পৌঁছাল।
এত ক্যামেরা সেখানে জড়ো হলো কীভাবে? সাংবাদিকদের গ্রুপে অভিযানের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বার্তা ঘুরছিল, যাতে মিডিয়া কভারেজের জন্য উপস্থিতি কাম্য বলা হয়েছিল। অর্থাৎ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাই ক্যামেরা ডেকে এনেছিল।
নৈতিকতার পাহারাদার কে
এটি ম্যোরাল পুলিশিংয়েরই ডিজিটাল রূপ। কে কোথায় গেল, কার সঙ্গে বসল, কী পরল, কীভাবে হাসল, এসব নিয়ে অচেনা মানুষের রায় দেওয়ার অধিকার আমরা নিজেরাই বানিয়ে নিয়েছি। জুলাইয়ে সিলেটের এক প্রধান শিক্ষকের ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে তাঁর চরিত্র ও শিক্ষকতার যোগ্যতা নিয়ে বিদ্রূপ ও নারীবিদ্বেষী মন্তব্যের বন্যা বয়ে যায়। পেশাগত আচরণে বাস্তব অভিযোগ থাকলে তদন্ত হতে পারে, কিন্তু সংঘবদ্ধ অনলাইন আক্রমণ তদন্তের বিকল্প নয়।
এ মাসে পূর্বাচলে একটি বাড়িতে অভিযানে ৮৫ জনকে আটক ও কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনা এই প্রশ্নকেই আবার সামনে এনেছে। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী আটকদের মধ্যে ২৬ জন নারী। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে প্রমাণ কী ছিল, সংক্ষিপ্ত বিচার কতটা স্বচ্ছ ছিল, এ নিয়ে ১০১ জন নাগরিক ও চারটি মানবাধিকার সংগঠন নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়েছে। পুলিশপ্রধান অবশ্য অভিযানের পক্ষে বলেছেন, আইন ও নৈতিকতার সীমার মধ্যেই সবাইকে চলতে হবে। বিতর্কটা তাই একটি অভিযানের বৈধতা ছাড়িয়ে নৈতিকতার নামে নাগরিকের ওপর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সীমা পর্যন্ত গড়িয়েছে। কারও জীবনযাপন অপছন্দ হতে পারে, কিন্তু তা কাউকে অপদস্থ করা বা সামাজিকভাবে দণ্ডিত করার বৈধতা দেয় না।
অভিযুক্তের মুখ দেখানো: আইন কী বলে
এখানে দুটি বিষয় আলাদা করা দরকার: অপরাধের সংবাদ প্রকাশ আর কাউকে জনসমক্ষে দোষী প্রতিষ্ঠা করা। অভিযুক্তের ছবি বা পরিচয় প্রকাশে সর্বাবস্থায় প্রযোজ্য কোনো সাধারণ নিষেধাজ্ঞা আমাদের আইনে নেই, এবং জনস্বার্থে অপরাধের খবর প্রকাশ গণমাধ্যমের বৈধ কাজ। কিন্তু সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিককে আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার দেয়, আর আইনসম্মত ভিত্তি ছাড়া কারও সুনাম ক্ষুণ্ণ করা যায় না। ৩২ ও ৩৩ অনুচ্ছেদেও ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গ্রেপ্তারকালীন সুরক্ষার নিশ্চয়তা আছে। আটক হওয়া মানে অধিকার হারানো নয়।
গ্রেপ্তার, অভিযোগপত্র, বিচার আর দণ্ড এক জিনিস নয়। শিরোনাম, ছবি আর উপস্থাপনায় “অভিযুক্ত”কে “অপরাধী” বানিয়ে ফেললে বিচারের আগেই সামাজিক দণ্ড হয়ে যায়, আর পরে নিরপরাধ প্রমাণিত হলেও সেই ক্ষতি ফেরানো যায় না।
এ বিষয়ে হাইকোর্টের ও সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ২০১৯ সালে রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির জামিন শুনানিতে বিচারপতি এনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ রিমান্ডে থাকা অবস্থায় তাঁর কথিত দোষ স্বীকার নিয়ে পুলিশ সুপারের সংবাদ সম্মেলনের সমালোচনা করেন। আদালত বলেন, আদালতে হাজির করার আগে আটক ব্যক্তিকে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করা অভিযুক্তের জন্য অপমানজনক এবং মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকেও সমর্থনযোগ্য নয়। আদালত স্বরাষ্ট্র সচিব ও আইজিপিকে এ বিষয়ে নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দেন, যাতে তদন্ত চলাকালে আটক ব্যক্তিকে গণমাধ্যমের সামনে আনার নিয়ম এবং কতটুকু তথ্য প্রকাশ করা যাবে, তা নির্ধারিত থাকে। সাত বছর পর হাতিরঝিলের রাত দেখায়, সেই নির্দেশনা মাঠপর্যায়ে কতটা পৌঁছেছে সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
ভুক্তভোগীর ক্ষেত্রে আইন আরও স্পষ্ট
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১৪ ধারায় নির্যাতনের শিকার নারী বা শিশুর পরিচয় যেকোনো মাধ্যমে প্রকাশ নিষিদ্ধ, লঙ্ঘনে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান আছে। যে তথ্যে ভুক্তভোগীকে চেনা যায়, সবই এর আওতায়। হাইকোর্ট মাগুরার শিশুর ছবি ও মুরাদনগরের ধর্ষণের ভিডিও সরাতে নির্দেশও দিয়েছেন।
তবু জুনে ঠাকুরগাঁওয়ে গণধর্ষণের অভিযোগকারী কিশোরীর সাক্ষাৎকারে সংকোচে আসা এক মুহূর্তের হাসিকে দুটি টিভি চ্যানেল বারবার দেখিয়ে শিরোনাম করে। ভিডিও লাখ লাখ বার দেখা হয়, শেষে চাপে পরিবারকে বাড়ি ছাড়তে হয়। আগস্টের শেষে সাভারের নির্যাতিত সাত বছরের শিশুকে দিয়ে ঘটনার বর্ণনা করিয়ে মুখ না ঢেকে ভিডিও প্রকাশ হয়েছে। প্রকাশকদের বিরুদ্ধে মামলার খবর জানা যায়নি, মামলা হয়েছে কেবল ধর্ষণের আসামিদের বিরুদ্ধে।
ক্যামেরার পেছনের মানুষ, পর্দার সামনের দর্শক
এ দায় শুধু মাঠের মোজোকর্মীর নয়। যিনি অভিযানে “উপস্থিত থাকুন” বলে ডাকেন, যিনি সম্পাদনার টেবিলে কিশোরীর হাসি তিনবার বসান, আর যে মালিক জেলা প্রতিনিধিকে মাসে দুই হাজার টাকাও না দিয়ে কার্ড ধরিয়ে বলেন “করে খাও”, সবাই একই শৃঙ্খলের অংশ। বেতনহীন সাংবাদিকতা মানেই ভিউ, চাঁদা বা ব্ল্যাকমেইলের ওপর নির্ভরতা।
এর চরম রূপ দেখা গেছে সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রামের হালিশহরে। সাংবাদিক ও পুলিশ পরিচয়ে পাঁচজন এক বাসায় ঢুকে ভিডিও শুরু করে, এক নারীকে যৌন হয়রানির চেষ্টা করে, আর ভিডিও ফেসবুকে ছাড়ার ভয় দেখিয়ে এক লাখ টাকা চায়। ক্যামেরা তখন আর সংবাদের যন্ত্র ছিল না, ছিল অপরাধের হাতিয়ার।
আবার ভুয়া কার্ড না থাকলেও ক্ষতি হয়। মে মাসে ৩২ লাখ অনুসারীর এক ফেসবুক পেজ এক বছর আগের একটি ভিডিও “ছেলের সামনে মাকে ধর্ষণ ও হত্যা” ক্যাপশনে ছড়ায়। প্রথম আলোর যাচাইয়ে বের হয়, ভিডিওটি থানায় অসুস্থ হয়ে পড়া এক নারীর। প্রায় ৯ লাখ মানুষ তা দেখেছে, বিচারও চেয়েছে। আমরা দর্শকরাও তাই এই চক্রের অংশ।
নতুন ক্ষমতা কি সমাধান
এই প্রেক্ষাপটে প্রেস কাউন্সিল সংসদীয় কমিটির কাছে সাংবাদিক নিবন্ধন, জরিমানা এবং “জাতীয় অখণ্ডতার জন্য ক্ষতিকর” খবরে স্বপ্রণোদিত ব্যবস্থার মতো ক্ষমতা চেয়েছে। শুনতে ভুয়া সাংবাদিক ঠেকানোর উদ্যোগ মনে হলেও প্রশ্ন থাকে: কে ঠিক করবে কে ভুয়া, আর কোন খবর ক্ষতিকর? সরকারি সংস্থার হাতে সেই সংজ্ঞা তুলে দিলে চাঁদাবাজির অভিযোগে প্রকৃত সাংবাদিককে হয়রানির পুরোনো নজির আরও শক্ত হবে। নোয়াব সভাপতিসহ অনেকেই আপত্তি তুলেছেন। যে আইন আছে তা প্রয়োগ না করে নতুন ক্ষমতা চাওয়া সমস্যার মূলে পৌঁছায় না।
মুক্তির পথ: করণীয়
- ভুক্তভোগীর পরিচয় ফাঁসের ক্ষেত্রে ভুয়া কার্ডধারী আর নিবন্ধিত চ্যানেল একই ধারায় বিচারের আওতায় আসুক। শুধু ভিডিও সরিয়ে ফেলা যথেষ্ট নয়।
- পুলিশের অভিযানে সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার ও আটক ব্যক্তিকে গণমাধ্যমের সামনে আনার বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা হোক। ২০১৯ সালের হাইকোর্টের নির্দেশনা কাগজে নয়, মাঠে কার্যকর হোক।
- নিউজরুমে সংবেদনশীল ফুটেজ প্রকাশের আগে যাচাইয়ের ধাপ ও সম্পাদকীয় দায় নির্ধারিত থাকুক। “ডিজিটাল ডেস্কের ভুল” বলে দায় এড়ানো বন্ধ হোক।
- গণমাধ্যম নিবন্ধনের শর্তে প্রতিনিধিদের ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করা হোক।
- দেখার আগে, শেয়ারের আগে ভাবুন। ভিউ না থাকলে এই ব্যবসা টিকত না।
আইনের চোখে সবাই সমান, ক্যামেরার চোখেও হোক
রাষ্ট্রের কাজ তদন্ত, আদালতের কাজ প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার, সাংবাদিকতার কাজ জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ। তিনটি ভূমিকা একাকার হয়ে গেলে নাগরিকের অধিকার বিপন্ন হয়। যে তরুণী হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেলে ছিলেন, তাঁর প্রাপ্য ছিল জরিমানা, সারা দেশের সামনে লজ্জা নয়। আইনের শাসন মানে শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া নয়, অভিযোগের মুখোমুখি মানুষটির অধিকারও রক্ষা করা। আর নৈতিকতা মানে অন্যের জীবন নিয়ন্ত্রণ নয়, নিজের আচরণে সংযম ও মানবিকতার পরিচয় দেওয়া।

