ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। নতুন চুক্তি না হলে দেশের পানিসংকট আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রভাব পড়বে কয়েক কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকায়। বার্তাসংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
১৯৯৬ সালে সই হওয়া বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১২ ডিসেম্বর। চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ সীমান্তের ২০ কিলোমিটার উজানে ভারতের ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে শুকনো মৌসুমে পানি ভাগ করা হয়। এই চুক্তিতে মেয়াদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। ফলে নতুন করে সমঝোতা না হলে চুক্তির কাঠামোই থাকবে না।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২ হাজার ৫২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ গঙ্গা বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল অববাহিকার মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে। এই নদী প্রায় ৬৫ কোটি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে ৫ কোটি মানুষ বাংলাদেশের। বাংলাদেশে গঙ্গা পদ্মা নামে পরিচিত।
নদীর বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন বরেন্দ্র অঞ্চলের ৭২ বছর বয়সী বাসিন্দা বিকাশ সোরেন। তিনি স্মৃতিচারণা করে বলেন, একসময় এই নদীতে সারা বছরই বড় নৌকা চলত। এখন বছরের প্রায় তিন মাস নদীর অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না। তাঁর দাবি, গত মৌসুমে পানির অভাবে ফসল নষ্ট হওয়ায় দুজন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। প্রবাহ কমে যাওয়ায় মাছও আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ৫৫ বছর বয়সী জেলে আবু বকর সিদ্দিক আগে নদীতে নানা ধরনের মাছ ধরতেন। এখন বাধ্য হয়ে পুকুরে মাছ চাষ করছেন। তাঁর প্রশ্ন, নদীতে মাছ না থাকলে তাঁরা কোথায় পাবেন।
নতুন চুক্তির প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও পানিবণ্টনবিষয়ক কারিগরি কমিটির প্রধান রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এএফপিকে বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সুবিধার ভিত্তিতে বাংলাদেশকে একটি নতুন চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে। দুই দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ৫৪টি অভিন্ন নদী নিয়ে পানিবণ্টনের বিরোধ কয়েক দশকের পুরোনো। তবে এর মধ্যে গঙ্গাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) সাবেক সদস্য মালিক ফিদা এ খান বলেন, ভারত নদীর উজানে অতিরিক্ত বাঁধ নির্মাণ করেছে। তাঁর মতে, নতুন চুক্তিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং পুরো নদী অববাহিকা বিবেচনায় রাখার বিষয়টি অবশ্যই থাকতে হবে।
কূটনৈতিক পরিস্থিতিও এ ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করেছে। বাংলাদেশ জানিয়েছে, চুক্তি নবায়নের আলোচনা শুরুর অনুরোধে ভারত এখনো সাড়া দেয়নি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, নদীসংক্রান্ত যেকোনো বিষয় যৌথ নদী কমিশনের আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হওয়া উচিত। এই কমিশনের কারিগরি পর্যায়ের সর্বশেষ বৈঠক হয়েছে গত মে মাসে। সরকারিভাবে নিশ্চিত সর্বশেষ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক হয়েছিল ২০২২ সালে, ১২ বছর বিরতির পর। তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে প্রস্তাবিত চুক্তিও ২০১১ সাল থেকে ঝুলে আছে।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাওয়ার পর থেকে ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন, ডিসেম্বরেই তিনি ভারত থেকে দেশে ফিরবেন। গঙ্গা চুক্তির মেয়াদও শেষ হচ্ছে একই মাসে। শোনা যাচ্ছে, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে যেতে পারেন। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
বিরোধের শুরু ১৯৭৫ সালে, যখন ভারত ২ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ ফারাক্কা বাঁধ চালু করে। বাংলাদেশের অভিযোগ ছিল, এর মাধ্যমে গঙ্গার পানির বড় অংশ সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে ১৯৭৭ সালে একটি চুক্তি হয়। তবে এক দশক পর সেই ব্যবস্থার মেয়াদ শেষ হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
ঢাকাভিত্তিক পরিবেশবাদী সংগঠন রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন বলেন, চুক্তি না থাকায় তখন গঙ্গা চরম সংকটে পড়েছিল এবং অন্তত তিনটি নদী প্রায় শুকিয়ে গিয়েছিল। এর মধ্যে ছিল গড়াই নদী, যা সুন্দরবনে মিঠা পানি সরবরাহ করে। বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত এই ম্যানগ্রোভ বনকে সমুদ্রপৃষ্ঠ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোনা পানির আগ্রাসন থেকে রক্ষায় গড়াইয়ের ভূমিকা অপরিসীম। একই সময়ে দেশের সবচেয়ে বড় গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প পানির অভাবে প্রায় অকেজো হয়ে পড়ে। প্রকল্পটি ৯৫৫ বর্গকিলোমিটার কৃষিজমিতে সেচ দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিল। বাসসের তথ্যমতে, চুক্তি থাকা সত্ত্বেও এর সেচ এলাকা কমে এখন ৫৫০ বর্গকিলোমিটারে নেমেছে।
শেখ রোকনের আশঙ্কা, এবার চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি আগের চেয়েও খারাপ হবে। কারণ দুই দেশেই মিঠা পানির চাহিদা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে এর পরিণতি হবে বিপর্যয়কর।
সংকট মোকাবিলায় গত মে মাসে সরকার ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। এর আওতায় ১১৩ মেগাওয়াটের একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রও থাকবে।
কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতি আগে থেকেই জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির চরম অভাব দেখা দিচ্ছে, আবার বর্ষায় ভয়াবহ বন্যা ফসলি জমি ও গ্রাম তলিয়ে দিচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত কয়েক বছরে পদ্মা তিন কিলোমিটার পর্যন্ত প্রশস্ত হয়েছে, যা আগের আকারের প্রায় দ্বিগুণ। ফিল্টের হাট গ্রামের ৫০ বছর বয়সী রেহানা খাতুন বন্যায় ঘরবাড়ি ভেসে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, নদীটি যেন দানবের মতো হয়ে পাড়ের সবকিছু গিলে খাচ্ছিল। বন্যার পানি নেমে গেলেও শিশুদের মন থেকে সেই আতঙ্ক সহজে যায় না বলে তিনি জানান।
সব মিলিয়ে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সময় খুব কম। একদিকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে টানাপোড়েন, অন্যদিকে আলোচনা শুরুর বিষয়ে ভারতের নীরবতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। এর মধ্যে জলবায়ুর চাপ ও বাড়তি পানির চাহিদা ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে। তাই পদ্মা ব্যারাজের মতো অভ্যন্তরীণ উদ্যোগের পাশাপাশি দ্রুত কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করাই এখন সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

