পুলিশের চাকরিতে থেকেও আইনজীবী সমিতির সদস্যপদ সক্রিয় রাখার অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনজুর কাদের ভূঁইয়াকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি। সমিতির নথি অনুযায়ী, তিনি ২০০২ সাল থেকে এ সংগঠনের সদস্য। এ ঘটনায় তাঁর বক্তব্য, পুলিশে যোগ দেওয়ার আগেই তিনি সদস্যপদ স্থগিতের আবেদন করেছিলেন।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন ঢাকা পোস্টকে জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে ওসির তর্কাতর্কির ঘটনার পর সমিতি জানতে পারে, সরাইল থানার দায়িত্বে থাকা মনজুর কাদের ভূঁইয়া চট্টগ্রাম বারের সদস্য। এরপরই তাঁকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
সাধারণ সম্পাদকের ভাষ্য, পুলিশের চাকরিতে থেকে আইনজীবী সমিতির সদস্যপদ সক্রিয় রাখা সমিতির বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শুধু এই একজন নন, অন্য পেশায় যুক্ত থেকেও সদস্যপদ ধরে রাখা ব্যক্তিদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
সমিতি সূত্রে জানা গেছে, আইন পেশায় নিয়মিত যুক্ত নন, অথচ সদস্যপদ বহাল রেখেছেন, এমন ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে সম্প্রতি উদ্যোগ নেয় চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি। এ লক্ষ্যে গত ২৫ জুন একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। তাতে সরকারি, আধা সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বিমা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত সদস্যদের ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে স্বেচ্ছায় সদস্যপদ স্থগিত করতে বলা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, সমিতির গঠনতন্ত্রের পরিচ্ছেদ ৩-এর ৭(১) বিধি অনুযায়ী আইন বিষয়ে শিক্ষকতা করেন কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানে আইন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন, তাঁরা প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র জমা দিয়ে সদস্যপদ রাখতে পারবেন। অন্যথায় বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিষ্ক্রিয় সদস্যদের শনাক্ত করতে নাম-ঠিকানাসহ তথ্য জমা দেওয়ার জন্য একটি অভিযোগ বাক্সও রাখা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে মনজুর কাদের ভূঁইয়া বলেন, পুলিশে যোগ দেওয়ার আগেই তিনি আইনজীবী সমিতির সদস্যপদ স্থগিতের আবেদন করেছিলেন। সমিতির নোটিশের জবাবে তিনি লিখিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও জমা দিয়েছেন।
এ বক্তব্য সঠিক কি না, তা এখন সমিতির যাচাইয়ের ওপর নির্ভর করছে। সমিতির নথিতে তিনি ২০০২ সাল থেকে সদস্য হিসেবে আছেন, অন্যদিকে তাঁর দাবি, সদস্যপদ স্থগিতের আবেদন আগেই করা হয়েছিল। দুই পক্ষের এই ভিন্ন বক্তব্যের মীমাংসা নির্ভর করবে জমা দেওয়া কাগজপত্র ও সমিতির নথিপত্র মিলিয়ে দেখার ফলাফলের ওপর।
আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত থেকে অন্য পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্নটি এখন আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। গত ২৬ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া এ বিষয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। রিটে আইন পেশার সনদ নিয়ে চাকরি, ব্যবসা বা অন্য পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
রিটকারী আইনজীবীর দাবি, বিষয়টি নিয়ে ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি তিনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে আবেদন করেছিলেন। কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না পেয়ে পরে আইনি নোটিশ পাঠান। তাতেও সাড়া না মেলায় তিনি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। অর্থাৎ বিষয়টি নিয়ে প্রায় ৩ বছর ধরে অভিযোগ থাকলেও বিধিবিধান প্রয়োগে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ।
ওসির সদস্যপদের বিষয়টি সামনে আসে সাম্প্রতিক একটি ঘটনার সূত্র ধরে। সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার সঙ্গে সরাইল থানার ওসির বাগ্বিতণ্ডার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। গত ২২ অক্টোবর রাতে দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শনের সময় নিরাপত্তা না পাওয়া এবং ওসির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে কথা বলতে রুমিন ফারহানা থানায় যান। সেখানে দুজনের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়।
সেই ঘটনার পরই আইনজীবী সমিতির নজর পড়ে ওসির সদস্যপদের দিকে। ফলে একটি স্থানীয় বিতর্ক থেকে শুরু হয়ে বিষয়টি এখন আইন পেশার শৃঙ্খলা ও সদস্যপদ-সংক্রান্ত বিধি প্রয়োগের বৃহত্তর প্রশ্নে রূপ নিয়েছে।
আপাতত নজর থাকবে দুটি বিষয়ে। প্রথমত, ওসির জমা দেওয়া ব্যাখ্যা ও কাগজপত্র খতিয়ে দেখে সমিতি কী সিদ্ধান্ত নেয়। দ্বিতীয়ত, হাইকোর্টে করা রিট আবেদনের বিষয়ে আদালত কী নির্দেশনা দেন। সমিতি আগেই জানিয়েছে, একই অভিযোগে অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধেও পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফলে এ ঘটনার প্রভাব শুধু একজন পুলিশ কর্মকর্তার মধ্যে সীমিত না-ও থাকতে পারে।

