আগামী জানুয়ারি থেকে বাসা ভাড়া বাড়ানোর নোটিশ পেয়ে নতুন দুশ্চিন্তায় পড়েছেন রাজধানীর অনেক পরিবার। মিরপুর থেকে যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা থেকে ধানমন্ডি, বিভিন্ন এলাকায় বাড়িওয়ালারা ভাড়া বাড়ানোর কথা জানিয়ে দিচ্ছেন। ভাড়াটিয়াদের হিসাবে, কারও ক্ষেত্রে বাড়তি ২ হাজার, কারও ৫ হাজার টাকা। গড়ে বৃদ্ধির হার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। অথচ বেশির ভাগ বেসরকারি চাকরিজীবীর বেতন বাড়েনি, বরং চাল থেকে শুরু করে স্কুলের বেতন পর্যন্ত সবকিছুর খরচ বেড়েছে।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলামের ঘটনাটি এই সংকটের একটি চেনা চিত্র। একটি বেসরকারি বিপণন কোম্পানিতে সাত বছর ধরে চাকরি করছেন তিনি। দুই বছর ধরে তাঁর বেতন আটকে আছে ৪০ হাজার টাকায়। বাড়িওয়ালার নোটিশে লেখা, জানুয়ারি ২০২৭ থেকে মাসিক ভাড়া ৩ হাজার টাকা বাড়ছে। রফিকুল জানান, গত এক বছরে চালের কেজি বেড়েছে ১৫ টাকা, ছেলের স্কুলের বেতন বেড়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা। এর ওপর বাড়তি ভাড়ার নোটিশ। তাঁর প্রশ্ন, বেতন না বাড়িয়ে সবকিছুর দাম বাড়ানো হলে মানুষ বাঁচবে কীভাবে। বাসা ভাড়াটা অন্তত এক বছর না বাড়ালে কি খুব ক্ষতি হতো, এমন প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
সংকট শুধু রফিকুলের একার নয়। মালিবাগে ২২ হাজার টাকায় ভাড়া থাকা স্কুলশিক্ষিকা নাহিদা আক্তার জানান, তাঁর সংসারে স্বামী-স্ত্রী দুজনই বেসরকারি চাকরিজীবী। গত ঈদে স্বামীর অফিস অর্ধেক বোনাস দিয়েছে, কারণ হিসেবে বলা হয়েছে কোম্পানির অবস্থা ভালো নয়। এ অবস্থায় ভাড়া ৫ হাজার টাকা বাড়লে মেয়ের গানের ক্লাস বন্ধ করে দিতে হবে বলে জানান তিনি।
যাত্রাবাড়ীতে ১৫ বছর ধরে একই বাসায় থাকছেন ৬২ বছর বয়সী জামাল উদ্দিন। তাঁর বাসার ভাড়া ১৪ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ১৮ হাজার টাকা। এই বয়সে নতুন বাসা খুঁজতে গেলে অগ্রিম টাকা, ট্রাক ভাড়াসহ বাড়তি খরচের চাপ সামলানো তাঁর পক্ষে কঠিন বলে জানান। তাঁর কথায়, শহরটা যেন তাঁদের মতো গরিবদের জন্য নয়।
নারী চাকরিজীবীরা আরও অসহায় অবস্থায় আছেন বলে মনে করছেন ভাড়াটিয়ারা। বাড্ডায় সাবলেটে থাকা সুমি আক্তার বলেন, নিরাপদ বাসার জন্য নারীরা ১-২ হাজার টাকা বেশি দিতেও রাজি থাকেন। বাড়িওয়ালারা এই দুর্বলতা জানেন এবং এটাও জানেন যে নারীরা সহজে বাসা ছাড়বেন না।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) হিসাবে, পাঁচ বছর আগে একজন মধ্যবিত্তের আয়ের ৩৫ শতাংশ বাসা ভাড়া ও খাবারে খরচ হতো। এখন তা ছাড়িয়ে গেছে ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ আয়ের অর্ধেকের বেশি যাচ্ছে মাথা গোঁজার ঠাঁই ও খাবারের জোগান দিতে। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন আছে ১৯৯১ সাল থেকে। তবে কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তা মানা হয় না বলে অভিযোগ। ভাড়া বাড়ানোর কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম নেই, জবাবদিহিও নেই।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত চার বছরে দেশে গড় বাসাভাড়া বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ভাড়া বেড়েছে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ। সর্বশেষ প্রান্তিকে বৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। ঢাকা বিভাগে এক বছরে ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ। ভাড়াটিয়াদের দাবি, সরকারি এই হিসাবের চেয়ে বাস্তবে ভাড়া আরও বেশি হারে বাড়ছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তিন কক্ষের ফ্ল্যাটের ভাড়া এলাকাভেদে ১৮ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে ৩ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি সার্ভিস চার্জ যুক্ত হয়।
ভাড়া বাড়ানোর পেছনে বাড়িওয়ালারা কয়েকটি যুক্তি দিচ্ছেন। ধানমন্ডির এক অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক বাড়িওয়ালা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের খরচ অনেক বেড়েছে। একটি ফ্ল্যাটে রং করাতে আগে ১৫ হাজার টাকা লাগত, এখন মিস্ত্রি চান ২৮ হাজার। পানির মোটর, লিফটের সার্ভিসিং, গ্যাস ও বিদ্যুতের বিলসহ সবকিছুর খরচই বেড়েছে। তাঁর মতে, ভাড়াটিয়ার মতো বাড়িওয়ালাকেও একই বাজারে বাজার করতে হয়।
মোহাম্মদপুরের নুরজাহান রোডের বাড়িওয়ালা আমিন মোহাম্মদ বলেন, সরকার পে-স্কেল বাড়ালে বাজারে ধারণা তৈরি হয় যে মানুষের হাতে টাকা এসেছে। তখন দোকানদার পণ্যের দাম বাড়ান। তাহলে বাড়িওয়ালা কেন বাড়াবেন না, এমন প্রশ্ন তাঁর। তিনি আরও বলেন, ঢাকায় প্রতিদিন মানুষ আসছে, বাসার চাহিদা প্রচুর। তিনি না বাড়ালেও পাশের বাড়ির মালিক বাড়াচ্ছেন। এটিকে তিনি বাজার অর্থনীতির বিষয় হিসেবে দেখছেন। তাঁর ভাষ্য, যার পোষাবে সে থাকবে, না পোষালে চলে যাবে, কারণ এখন ভাড়াটিয়ার অভাব নেই।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেলের আলোচনা বাজারে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। অনেকেই ধরে নিচ্ছেন, সবার বেতনই বুঝি বাড়ছে। বাড়িওয়ালাদের একাংশ এই ধারণাকে ভাড়া বাড়ানোর যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করছেন। কিন্তু বেসরকারি খাতের অনেক চাকরিজীবীর ক্ষেত্রে বাস্তবতা ভিন্ন। তাঁদের বেতন বা বোনাস কোনোটাই বাড়েনি।
ক্যাবের সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ঢাকায় জনসংখ্যার তুলনায় ভাড়া বাসার চাহিদা বেশি বলে ভাড়াও বেশি। চাহিদা না থাকলে ভাড়া সহনীয় পর্যায়ে থাকত। বাড়িওয়ালারা ভাড়া বাড়ানোর পেছনে যুক্তি দেন, তবে তা কতটা যৌক্তিক, তা যাচাইয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের বিধিমালা প্রণয়ন জরুরি বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, ভাড়াসংক্রান্ত বিষয়গুলো আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়েই নিষ্পত্তি করা সম্ভব।
সব মিলিয়ে ঢাকার ভাড়াবাজারে একদিকে আছে বাড়তে থাকা চাহিদা ও বাড়িওয়ালাদের ব্যয়ের যুক্তি, অন্যদিকে স্থির আয় ও বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার খরচে চাপে থাকা ভাড়াটিয়ারা। মাঝখানে কার্যকর কোনো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় সিদ্ধান্ত কার্যত একতরফাভাবেই হচ্ছে। বিধিমালা ছাড়া ১৯৯১ সালের আইন যে কার্যকর হচ্ছে না, তা এই পরিস্থিতিতে স্পষ্ট। এখন দেখার বিষয়, জানুয়ারির আগে সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভাড়া নিয়ন্ত্রণে কোনো উদ্যোগ নেয় কি না।

