গাজীপুর-বিমানবন্দর বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প বাতিল ঘোষণা করেছে সরকার। ১৪ বছর ধরে চলা এ প্রকল্পের পেছনে ইতিমধ্যে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছে। ঠিকাদারদের বকেয়া বিলও দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। অথচ এই বিশেষায়িত বাস সার্ভিস আজ পর্যন্ত একজন যাত্রীও ব্যবহার করতে পারেননি।
গত ১৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। একই বৈঠকে ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি গুটিয়ে ফেলার নির্দেশও দেওয়া হয়। বিআরটির বদলে ২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডোরকে প্রথাগত ছয় লেনের মহাসড়কে রূপান্তর করা হবে।
প্রকল্পটি ঢাকার সঙ্গে গাজীপুর ও উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর সংযোগকারী প্রধান মহাসড়কের ওপর অবস্থিত। এটিকে বিআরটি লেনে রূপান্তর করতে গিয়ে ইউটিলিটি স্থানান্তর ও স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হয়েছে। বছরের পর বছর খোঁড়াখুঁড়িতে প্রতিদিন ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে লাখো মানুষকে। নির্মাণকাজের সময় ক্রেন থেকে একটি গাড়ির ওপর কংক্রিটের গার্ডার পড়ে একই পরিবারের পাঁচ সদস্যের মৃত্যুও হয়েছে।
২০২৫ সালের মে মাসের মধ্যে প্রকল্পের ভৌত কাজের ৭৭ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হওয়ার দাবি করা হয়েছিল। তবু শেষ পর্যন্ত প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতে হলো।
অন্তর্বর্তী সরকার প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ আর বাড়াতে রাজি না হলে একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন করা হয়। তাদের পর্যালোচনার পর বাতিলের সিদ্ধান্ত আসে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি বিশেষজ্ঞ দল মত দেয়, গাজীপুর-বিমানবন্দর সড়কের মতো অপ্রশস্ত করিডোরে স্বতন্ত্র বিআরটি ব্যবস্থা কখনোই নিরাপদে চালানো সম্ভব নয়। তারা আংশিক নির্মিত অবকাঠামোকে দূরপাল্লার ও দ্রুতগতির যানবাহনের উপযোগী উন্নত মহাসড়কে রূপান্তরের সুপারিশ করে।
প্রকল্পের ত্রুটি আগেই জানা ছিল। ২০২০ সালের শুরুতেই পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) নকশার গুরুতর ত্রুটি, ঠিকাদারদের নিম্নমানের কাজ ও দুর্বল তদারকি নিয়ে সতর্ক করেছিল। সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান প্রকাশ্যে বলেছিলেন, সরকারি সংস্থাগুলো প্রকল্প অনুমোদন পেতে নিয়মিত নিম্নমানের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা যুক্ত করে দেয়। ২০২২ সালের অক্টোবরে সাবেক সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নির্মাণকাজের ব্যাপক বিশৃঙ্খলার কথা স্বীকার করেন। তবু তিনি যেভাবেই হোক প্রকল্প শেষ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
২০১৬ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যে শুরুতে প্রকল্পের বাজেট ধরা হয়েছিল ২ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। দফায় দফায় সংশোধনের পর বাতিলের আগে প্রাক্কলিত ব্যয় দাঁড়ায় ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা। মেয়াদ বেড়ে ঠেকে ২০২৯ সালে।
বিআরটির ধারণা প্রথম জাতীয় পরিকল্পনায় যুক্ত হয় ২০০৫ সালের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার (এসটিপি) মাধ্যমে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এটি তৈরি করেছিল লুই বার্জার গ্রুপ। পরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের আওতায় লাইন-৩-এর প্রাথমিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় অর্থায়ন করে। সেখানে প্রক্ষেপণ ছিল, এই রুটে ঘণ্টায় ২০ হাজার যাত্রী চলাচল করতে পারবে এবং গাজীপুর থেকে বিমানবন্দরে পৌঁছাতে সময় লাগবে মাত্র ২০ মিনিট।
পরে তৎকালীন সরকার প্রকল্পটি গ্রহণ করে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ উদ্যোক্তা এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পায়। শুরুতে ২ হাজার ১৩৫ কোটি টাকায় প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অর্থ সরকারের দেওয়ার কথা ছিল। এডিবি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ৭০৭ কোটি টাকার। বাস্তব চিত্র ছিল প্রক্ষেপণের সম্পূর্ণ বিপরীত। তৎকালীন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ পরে প্রকল্পটিকে ‘দানবীয় ও অপরিকল্পিত’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
বুয়েটের মূল্যায়ন এডিবি এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রকৌশল নকশা প্রণয়নকারী আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। সওজের কাছে হস্তান্তরের আগে প্রকল্পটি মূলত এডিবির অর্থায়নের উদ্যোগ হিসেবে শুরু হয়েছিল। করিডোরে জায়গার মৌলিক সংকট প্রাথমিক মূল্যায়নের সময়ই ধরা পড়ার কথা ছিল। অ্যাডভান্সড লজিস্টিকস গ্রুপ, বেটস-টিএমবি জেভি, স্মেক ইন্টারন্যাশনাল, সিস্ত্রা ও এইস কনসালট্যান্টস প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশার দায়িত্বে ছিল।
টিবিএস যোগাযোগ করলে এডিবি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। অ্যাডভান্সড লজিস্টিকস গ্রুপ জানিয়েছে, তাদের সমীক্ষা অনেক বছর আগে করা হয়েছিল এবং তখন সরকারি প্রতিষ্ঠান, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংক ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছিল।
প্রকল্প বাতিলের পরও করদাতাদের ওপর চাপ থেকে যাচ্ছে। এখন করদাতাদের অর্থেই করিডোরটিকে সাধারণ সড়কে রূপান্তর করতে হবে। একই সঙ্গে এডিবি ও ফরাসি উন্নয়ন সংস্থার ছাড় করা ২৫৬ মিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের ব্যর্থতা এড়াতে প্রকল্পের পুরো জীবনচক্রজুড়ে আনুষ্ঠানিক ও স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। প্রাথমিক অনুমোদন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষার যথার্থতা, ঠিকাদার নির্বাচন এবং ত্রুটি জানা সত্ত্বেও বারবার মেয়াদ বাড়ানো, সবই এর আওতায় আনার কথা বলা হচ্ছে। উন্নয়ন সহযোগী ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোও শুধু সরকারের অনুমোদনের অজুহাতে জবাবদিহি থেকে রেহাই পেতে পারে না বলে মত দেওয়া হচ্ছে।

