দেশজুড়ে দুই কোটিরও বেশি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) খালি সিলিন্ডার অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কোনোটি পরিবেশকদের গুদামে, আবার কোনোটি মাসের পর মাস পড়ে আছে গ্রাহকদের বাসায়। বড় কয়েকটি কোম্পানির গ্যাস আমদানি কমে যাওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং এক কোম্পানির সিলিন্ডারে অন্য কোম্পানির গ্যাস ভরার সুযোগ না থাকায় তৈরি হয়েছে এই সংকট।
এর ফলে একদিকে পরিবেশকদের ব্যবসায়িক খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ গ্রাহক। আগের ব্যবহৃত কোম্পানির সিলিন্ডারে গ্যাস না পাওয়ায় অনেককে নতুন ব্র্যান্ডের সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। অথচ পুরোনো সিলিন্ডারটি কোনো কাজে আসছে না।
রোববার (১ নভেম্বর) প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে এ পরিস্থিতির বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
আমদানি কমায় বাজারে তৈরি হয়েছে সংকট
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আর্থিক সংকট ও ব্যাংকিং জটিলতার কারণে বড় কয়েকটি এলপিজি কোম্পানি প্রায় দুই বছর ধরে প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস আমদানি করতে পারছে না। বিশেষ করে ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তাদের আমদানি কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) তথ্য অনুযায়ী, বসুন্ধরা, বেক্সিমকো, ওরিয়ন, গ্রিনটাউন, ইউনিটেক্স, জেএমআই ও ইউনিভার্সাল—এই সাতটি প্রতিষ্ঠানের আমদানি গত দুই অর্থবছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান আমদানি পুরোপুরি বন্ধও রেখেছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইউনিটেক্স ১ লাখ ৫৫ হাজার টন এলপিজি আমদানি করলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি কোনো গ্যাস আমদানি করেনি। একই সময়ে দেশের অন্যতম বড় আমদানিকারক বসুন্ধরার আমদানি ১ লাখ ৩৮ হাজার টন থেকে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১০ হাজার ২৭ টনে।
সাতটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জেএমআই ছাড়া অন্যরা সর্বশেষ অর্থবছরে আমদানিকারকদের তালিকা থেকে কার্যত ছিটকে পড়েছে। জেএমআইও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাত্র ৮ হাজার ৮০০ টন এলপিজি আমদানি করেছে। আগের দুই অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির আমদানি ছিল প্রতিবছর ৫০ হাজার টনের বেশি।
এক কোম্পানির সিলিন্ডারে অন্য কোম্পানির গ্যাস ভরা যায় না
এলপিজি ব্যবসায় সাধারণত কোম্পানিগুলো পরিবেশকদের জামানতের বিপরীতে সিলিন্ডার সরবরাহ করে। পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারাও গ্রাহকের কাছ থেকে প্রথমবার সিলিন্ডার নেওয়ার সময় জামানত রাখেন। পরবর্তী সময়ে গ্রাহক খালি সিলিন্ডার জমা দিয়ে গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার সংগ্রহ করেন।
কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের গ্যাস বাজারে না পাওয়া গেলে সেই কোম্পানির খালি সিলিন্ডার অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে বদলে নেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে গ্রাহককে নতুন কোম্পানির সিলিন্ডার কিনতে হয়। পুরোনো সিলিন্ডারটি পড়ে থাকে অব্যবহৃত অবস্থায়।
দেশে বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টন এলপিজি ব্যবহৃত হয়। ১২ কেজির সিলিন্ডার হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ বার পুনরায় গ্যাস ভরার সমান।
দেশের এলপিজি বাজারের প্রায় ৯৯ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট ১৭ লাখ ৪৩ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। এর ৭০ শতাংশের বেশি এসেছে মাত্র সাতটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।
বিইআরসি ৩৫টি প্রতিষ্ঠানকে এলপিজি আমদানির অনুমতি দিলেও দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় আমদানিকারকের সংখ্যা ১০ থেকে ১২টির মধ্যে সীমাবদ্ধ।
সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখতে প্রয়োজন কয়েক কোটি সিলিন্ডার
খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, এলপিজি সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে প্রতিবার গ্যাস ভরার বিপরীতে তিন থেকে চারটি সিলিন্ডার প্রয়োজন হয়। কারণ, একই সময়ে কিছু সিলিন্ডার গ্রাহকের কাছে, কিছু খুচরা বিক্রেতা ও পরিবেশকের কাছে এবং বাকিগুলো কারখানায় থাকে।
বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখতে দেশে আনুমানিক ৩ কোটি ৭৫ লাখ থেকে ৫ কোটি সিলিন্ডার প্রয়োজন।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের ধারণা, সাতটি বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের কাছে বাজারে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ সিলিন্ডার রয়েছে। এসব সিলিন্ডার দিয়েই দেশের অধিকাংশ গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। অন্যদিকে, যেসব প্রতিষ্ঠানের আমদানি খুব কম বা বন্ধ, তাদের দুই কোটির বেশি সিলিন্ডার অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে।
ঢাকার এলপিজি পরিবেশক আবু তাহের কুরেশী জানান, তাঁর গুদামে বিভিন্ন কোম্পানির প্রায় ৩ হাজার খালি সিলিন্ডার পড়ে আছে। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সেগুলো ফেরত নেওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত কেউ নেয়নি।
তিনি জানান, এসব সিলিন্ডারের জন্য গুদামভাড়া ও কর্মীদের বেতন বাবদ অন্তত নয় মাস ধরে খরচ বহন করতে হচ্ছে। অথচ সেগুলো থেকে কোনো আয় হচ্ছে না।
বৃহস্পতিবার বিইআরসির এক গণশুনানিতেও পরিবেশক ও ভোক্তারা বিষয়টি তুলে ধরেন। এলপিজি আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন ও মাশুল বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে আয়োজিত ওই শুনানিতে অব্যবহৃত সিলিন্ডারকে ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এলপি গ্যাস ট্রেডার্স কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের সভাপতি সেলিম খান বিষয়টি সমাধানে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাদা বৈঠকের আশ্বাস দিয়েছেন।
ব্যাংকিং জটিলতাকে দায়ী করছে আমদানিকারকেরা
ওরিয়ন গ্যাস লিমিটেডের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা অনুপ কুমার সেন জানান, ব্যাংকের ঋণসীমা শেষ হয়ে যাওয়া এবং ঋণপত্র খোলার বিপরীতে নগদ জমার শর্ত পরিবর্তনের কারণে তাদের এলপিজি আমদানি কমেছে।
আগে ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা অনুযায়ী ১০ শতাংশ নগদ জমা দিয়েই ঋণপত্র খোলা সম্ভব হতো। কিন্তু ঋণসীমা শেষ হওয়ার পর ব্যাংক ১০০ শতাংশ নগদ জমা দেওয়ার শর্ত আরোপ করে। এত বিপুল অর্থ একসঙ্গে জোগাড় করা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব হয়নি। ফলে আমদানি কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ে।
জেএমআই এলপিজির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নুরুল আলম আন্তর্জাতিক সরবরাহ সংকটকে আমদানি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে এলপিজি সরবরাহকারী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা একাধিক থাকলেও ২০২৫ সালে তা কমে মাত্র দুটি প্রধান প্রতিষ্ঠানে দাঁড়ায়। নির্দিষ্ট সরবরাহ চুক্তি না থাকায় বাজারে সংকট তৈরি হলে জেএমআই প্রয়োজনীয় চালান সংগ্রহ করতে পারেনি।
আগে বাংলাদেশের এলপিজি সরবরাহের প্রায় ৩০ শতাংশ আসত মধ্যপ্রাচ্য থেকে। তবে ওই অঞ্চল থেকে চালান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমদানিকারকদের যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
নুরুল আলম জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেএমআই প্রায় ৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি করেছে। সরবরাহ সচল রাখতে সৌদি চুক্তিমূল্যের তুলনায় প্রতি টনে অতিরিক্ত ৩০০ থেকে ৩৫০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত বেশি দিতে হয়েছে। এ কারণে লোকসান দিয়েও বাজারে গ্যাস সরবরাহ করতে হয়েছে।
অন্যদিকে, বসুন্ধরা এলপি গ্যাসের বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মো. রেদওয়ানুর রহমান জানান, ২০২৫ সালে ব্যাংকিং বিধিনিষেধ ও ঋণপত্রসংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় আমদানি চুক্তি করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের সঙ্গে সাধারণত প্রায় এক বছর আগেই গ্যাস কেনার চুক্তি করতে হয়। কিন্তু ব্যাংকিং জটিলতায় নির্ধারিত সময়ে সেই চুক্তি করা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তী সময়ে কিছু জটিলতা কাটিয়ে চলতি বছরের জুলাই ও আগস্টে ঋণপত্র খুলে খোলা বাজার থেকে প্রায় ১০ হাজার টন এলপিজি আমদানি করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে ইরান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় নতুন করে বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। জাহাজের সংকট ও বিমা জটিলতায় গ্যাস পরিবহন কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি।
অব্যবহৃত সিলিন্ডার ফেরত নেওয়ার বিষয়ে কোম্পানিগুলোর অবস্থান
অব্যবহৃত সিলিন্ডার নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থানেও পার্থক্য রয়েছে। জেএমআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গ্রাহক বা পরিবেশকদের কাছ থেকে সিলিন্ডার ফেরত নেওয়ার পরিকল্পনা তাদের নেই। তাঁর মতে, সিলিন্ডারগুলো কোম্পানির সম্পদ হলেও নামমাত্র মূল্যে গ্রাহকদের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে। সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনরায় গ্যাস ভরার দায়িত্বও প্রতিষ্ঠানটির। তাই বেশি দামে হলেও অন্য আমদানিকারকদের কাছ থেকে গ্যাস সংগ্রহ করে সরবরাহ চালু রাখার চেষ্টা করছে তারা।
অন্যদিকে, বসুন্ধরা এলপি গ্যাসের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যেসব পরিবেশক বা গ্রাহক তাদের পণ্য আর ব্যবহার করতে চান না, তাদের কাছ থেকে সিলিন্ডার ফেরত নিতে প্রতিষ্ঠানটি প্রস্তুত। পরিবেশকেরা সরাসরি কোম্পানির কাছে সিলিন্ডার ফেরত দিয়ে টাকা নিতে পারবেন। গ্রাহকেরাও পরিবেশক অথবা সরাসরি কারখানার মাধ্যমে সিলিন্ডার ফেরত দিতে পারবেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এলপিজি বাজারে স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমদানি সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের অব্যবহৃত সিলিন্ডার ব্যবস্থাপনার সমাধান জরুরি। অন্যথায় বিপুলসংখ্যক সিলিন্ডার পড়ে থাকার কারণে ব্যবসায়িক ব্যয় ও গ্রাহকের ভোগান্তি—দুটিই বাড়তে থাকবে।

