রাজধানীর সরকারি কলোনিগুলোতে সাবলেট ও ভাড়াটে থাকা নিয়ে কড়াকড়ির জেরে চরম বিপাকে পড়েছেন শত শত শিক্ষার্থী। সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা ৩১ অক্টোবর শেষ হয়েছে। এখন মাঠে নামছেন পরিদপ্তরের কর্মকর্তারা। পরিদর্শনে কোনো সরকারি ফ্ল্যাটে ভাড়াটে পাওয়া গেলে বরাদ্দপ্রাপ্ত কর্মচারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি আবাসন পরিদপ্তর গত বৃহস্পতিবার একটি জরুরি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে। তাতে বলা হয়, ৩১ অক্টোবরের পরও কোনো সরকারি ফ্ল্যাটে সাবলেট বা ভাড়াটে পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট চাকরিজীবীর বাসা বরাদ্দ বাতিল করা হবে। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ও আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়। এই নির্দেশের পর গত কয়েক দিনে আজিমপুর ও পলাশীর সরকারি কলোনি থেকে শত শত শিক্ষার্থী ও অন্যান্য পেশার ভাড়াটে বাসা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। অনেকেই এখনো নতুন আশ্রয় জোগাড় করতে পারেননি।
শনিবার সকালে আজিমপুর সরকারি কলোনির জোন-বি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন ভবন থেকে ভ্যানগাড়িতে আসবাব ও মালপত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বেলা সোয়া ১১টার দিকে সেখানে কথা হয় ইডেন মহিলা কলেজের তৃতীয় বর্ষের এক ছাত্রীর সঙ্গে। তিনি একটি ভবনের ফ্ল্যাটে একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে থাকতেন। নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি জানান, ২২ অক্টোবর হঠাৎ বাড়িওয়ালা তাঁকে বাসা ছাড়ার নোটিশ দেন। তখন তিনি দুর্গাপূজার ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। ২৬ অক্টোবর ঢাকায় ফিরে আর বাসায় থাকতে পারেননি। কয়েক দিন যেখানে সম্ভব সেখানেই রাত কাটিয়েছেন। বাড়িওয়ালার নির্দেশ ছিল, ৩১ তারিখের মধ্যে সব জিনিসপত্র নিয়ে বের হতে হবে।
ওই ছাত্রীর ভাষ্য, বাসা ছাড়তে হলে অন্তত দুই মাস আগে জানানোর কথা ছিল। ভাড়াটে ছাড়তে চাইলেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। কিন্তু বাস্তবে তা মানা হয়নি। তাঁর আশঙ্কা, আগামী ডিসেম্বরে চূড়ান্ত পরীক্ষা। এই অবস্থায় প্রস্তুতি কীভাবে নেবেন, সেটাই তাঁর কাছে বড় দুশ্চিন্তা। মানসিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠতেই অন্তত এক মাস লাগবে বলে মনে করেন তিনি।
আজিমপুর কলোনিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সায়েন্স ও ঢাকা কলেজসহ নানা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সাবলেট থাকেন। এঁদের মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যাই বেশি। সরকারি কলোনি হওয়ায় নিরাপত্তার কারণে তাঁরা এখানে থাকতে স্বস্তি বোধ করেন। শিক্ষার্থীদের বড় অংশ এসেছেন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবাসিক হলে আসন পাওয়া সহজ নয় বলে বাধ্য হয়েই তাঁরা ভাড়ায় থাকেন। এই কলোনিতে মোট কতজন শিক্ষার্থী থাকেন, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে শিক্ষার্থীদের ধারণা, সংখ্যাটি হাজারের বেশি হতে পারে।
সরকারি বাসা ভাড়া দেওয়ার প্রবণতা নতুন নয়। আজিমপুরসহ রাজধানীর সরকারি কলোনিগুলোয় দীর্ঘদিন ধরেই এটি চলে আসছে। কেউ পুরো ফ্ল্যাট ভাড়া দেন, কেউ আবার এক বা দুটি কক্ষ। অনুসন্ধানে জানা যায়, যাঁরা পুরো বাসা ভাড়া দেন, তাঁদের একাংশ কম খরচে অন্য কোথাও থাকতে চান এবং সরকারি বাসা ভাড়া দিয়ে বাড়তি আয় করেন। আরেক অংশের উপরি বা অন্য উৎস থেকে যথেষ্ট আয় আছে। পুরোনো সরকারি বাসায় থাকতে তাঁদের আগ্রহ কম, তবু বাসাটি ভাড়া দিয়ে বাড়তি আয়ের সুযোগ ছাড়তে চান না। অন্যদিকে যাঁরা শুধু এক-দুটি কক্ষ ভাড়া দেন, তাঁদের বেশির ভাগের কারণ বেতনে সংসার না চলা। এই কলোনিতে সরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশই বাসা ভাড়া দিতেন। আরেক অংশ বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন, বিশেষ করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অনেকেই এটি পছন্দ করতেন না।
আজিমপুর কলোনির জোন-বি এলাকার ২২ নম্বর ভবনের পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব আলম জানান, কেউ কেউ হয়তো একটি কক্ষ ভাড়া দিয়েছিলেন এবং এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। তবে ইতিমধ্যে সবাইকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন ওই ভবনে কোনো ভাড়াটে নেই।
শিক্ষার্থীরা জানান, নতুন বাসা পেতে সাধারণত অন্তত এক মাস আগে থেকে খোঁজ শুরু করতে হয়। কিন্তু এত কম সময়ে সেটি সম্ভব হয়নি। বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের তৃতীয় বর্ষের এক ছাত্রী বলেন, তিনি প্রতিদিন রাত ১১টা-১২টা পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় বাসা খুঁজেছেন, কিন্তু পাননি। হলে আসন না পেয়েই তাঁরা বাইরে ভাড়া থাকতে বাধ্য হন বলে জানান তিনি। ওই ছাত্রী কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে জরুরি ভিত্তিতে আবাসিক হলে আসনের ব্যবস্থা করার অনুরোধও জানিয়েছেন।
রাজধানীর সব কলোনিতে অবশ্য একই চিত্র দেখা যায়নি। মিরপুর-১ নম্বরের পাইকপাড়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আবাসন এলাকায় শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত অবস্থান করেও কাউকে বাসা ছাড়তে দেখা যায়নি। কলোনির গেটের নিরাপত্তাপ্রহরী ও আশপাশের দোকানদাররাও জানান, এদিন কাউকে বাসা ছাড়তে দেখেননি তাঁরা। একই এলাকার ওয়াক-আপ সরকারি কর্মচারী আবাসনের পুরোনো পাঁচতলা ভবনগুলোর সামনে কয়েকজন তরুণ জানান, ফাঁকা বাসাগুলোয় গণপূর্ত অধিদপ্তর অভিযান চালিয়ে সিলগালা করে দিয়েছে। সেখানকার অনেক বাসিন্দা পাশের নতুন বহুতল ভবনে উঠে গেছেন।
সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজধানীতে বিভিন্ন শ্রেণির মোট ১৯ হাজার ৯১টি সরকারি বাসা রয়েছে। এর মধ্যে ভাড়ার চাহিদা সবচেয়ে বেশি আজিমপুর এলাকার ফ্ল্যাটগুলোর, যেখানে ফ্ল্যাটের সংখ্যা ৩ হাজার ২৫২টি।
পরিদপ্তরের পরিচালক জহিরুল ইসলাম খান জানান, যাঁরা ভাড়া বা সাবলেট থাকছিলেন, তাঁদের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে বাসা ছাড়তে বলা হয়েছিল। এখন পরিদপ্তরের কর্মকর্তারা পরিদর্শনে যাবেন। সেখানে কোনো সাবলেট বা ভাড়াটে পাওয়া গেলে বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর দাবি, অধিকাংশ ভাড়াটে ইতিমধ্যে বাসা ছেড়ে দিয়েছেন, কেউ কেউ ছাড়ার প্রক্রিয়ায় আছেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, হঠাৎ করে বাসা ছাড়তে বলায় তাঁরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। এ বিষয়ে পরিচালক বলেন, এক দিনের নোটিশে কাউকে বাসা ছাড়তে বলা হয়নি, এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছিল। তাঁর প্রশ্ন, যাঁরা অবৈধভাবে সেখানে বসবাস করছেন, তাঁদের কেন বাড়তি সময় দেওয়া হবে।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, আজিমপুর কলোনিতে বাসা ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি সবারই জানা। তাই ভাড়াটে সরানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁদের আপত্তি নেই। তবে এত অল্প সময়ে বাসা খুঁজে নেওয়া বাস্তবে অসম্ভব বলে মনে করেন তাঁরা। এক ছাত্রী বলেন, সাত দিনে বাসা পাওয়া যায় না। তিনি হেঁটে হেঁটে বাসা খুঁজেছেন, কিন্তু পাননি। তাঁর প্রশ্ন, এক মাস সময় দিলে সরকারের কী ক্ষতি হতো।
সব মিলিয়ে সরকারি বাসার অপব্যবহার ঠেকানোর উদ্যোগ এক দিকে যেমন আইনি ও প্রশাসনিক দিক থেকে যুক্তিসংগত, অন্য দিকে আবাসন সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য এর মানবিক প্রভাবও উপেক্ষা করার মতো নয়। হলে পর্যাপ্ত আসন না থাকায় বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া এমন কড়াকড়ি তাঁদের পড়াশোনা ও নিরাপত্তার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। এখন নজর পরিদর্শনের দিকে, আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আবাসনের জরুরি ব্যবস্থা করে কি না, সেটিও দেখার বিষয়।

