দেশে কর্মজীবী মানুষের মধ্যে আর্থিক অনিশ্চয়তা ক্রমেই বাড়ছে। সংসারের খরচ, ভবিষ্যতের সঞ্চয় এবং হঠাৎ বড় অঙ্কের ব্যয়ের চিন্তা কর্মক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের প্রায় ৭২ শতাংশ কর্মী জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তার কারণে তাঁদের কাজের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এক বছর আগে এই হার ছিল ৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে আর্থিক চাপের কারণে কর্মদক্ষতা কমে যাওয়ার অভিযোগ বেড়েছে ১৬ শতাংশীয় পয়েন্ট।
বেসরকারি জীবনবিমা প্রতিষ্ঠান মেটলাইফ বাংলাদেশের নতুন এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের কর্মী সুযোগ-সুবিধা ও প্রত্যাশাবিষয়ক এই গবেষণায় বিভিন্ন খাতের ৭০৯ জন অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ৫৮৩ জন কর্মী এবং ১২৬ জন নিয়োগকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি। তৈরি পোশাক, উৎপাদন, ব্যাংক, বিমা, মুঠোফোন সেবা, খুচরা ব্যবসা, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মীরা জরিপে অংশ নেন।
জরিপে দেখা গেছে, কর্মীরা এখন শুধু মাসিক বেতন বা প্রচলিত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চাইছেন না। ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও তাঁরা নিয়োগকর্তাদের কাছ থেকে সহযোগিতা প্রত্যাশা করছেন। বিশেষ করে অবসরজীবনের জন্য সঞ্চয় এবং হঠাৎ কোনো আর্থিক সংকট দেখা দিলে সহায়তার বিষয়টি তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০২৬ সালের জরিপে ৮৬ শতাংশ কর্মী মনে করেন, অবসরজীবনের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ সঞ্চয়ে নিয়োগকর্তাদের সহযোগিতা করা উচিত। ২০২৫ সালে এ হার ছিল ৬৭ শতাংশ। একইভাবে ৮১ শতাংশ কর্মী মনে করেন, তাঁদের আর্থিক সুরক্ষার দায়িত্বও প্রতিষ্ঠানের রয়েছে। আগের বছর এই মত পোষণ করেছিলেন ৬৯ শতাংশ কর্মী। অর্থাৎ কর্মীদের প্রত্যাশায় এক বছরের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।
তবে আর্থিক দুশ্চিন্তা বাড়লেও চাকরি নিয়ে সন্তুষ্টির ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতি দেখা গেছে। জরিপে অংশ নেওয়া কর্মীদের ৮৩ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা নিজেদের চাকরি নিয়ে সন্তুষ্ট। ২০২৫ সালে এই হার ছিল ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ চাকরির প্রতি সন্তুষ্টি বাড়লেও নিজেদের কর্মস্থলকে অন্যদের কাছে ভালো প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুপারিশ করতে আগ্রহী কর্মীর সংখ্যা কমেছে।
২০২৫ সালে ৪২ শতাংশ কর্মী তাঁদের কর্মস্থলকে অন্যদের কাছে কাজের উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুপারিশ করতে চেয়েছিলেন। ২০২৬ সালে সেই হার কমে দাঁড়িয়েছে ৩৫ শতাংশে। জরিপে আরও দেখা গেছে, কর্মীদের চাকরির সন্তুষ্টির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওয়া মূল্যায়ন ও যত্নের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। যাঁরা মনে করেন তাঁদের প্রতিষ্ঠান কর্মীদের গুরুত্ব দেয়, তাঁদের মধ্যে ৯২ শতাংশ চাকরি নিয়ে সন্তুষ্ট। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে যথেষ্ট সহযোগিতা পান না বলে মনে করা কর্মীদের মধ্যে সন্তুষ্টির হার মাত্র ৪৮ শতাংশ।
কর্মীদের কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে আর্থিক সংকট ও আকস্মিক ব্যয়ের সময় প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা। জরিপে ৭২ শতাংশ কর্মী জানিয়েছেন, বড় ধরনের আর্থিক সমস্যা বা অপ্রত্যাশিত খরচের মুখে পড়লে নিয়োগকর্তার সহায়তা তাঁদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, পরিবারের অসুস্থ সদস্যের দেখাশোনা এবং গুরুতর রোগ শনাক্ত হওয়ার মতো পরিস্থিতিতেও তাঁরা কর্মস্থলের সহযোগিতা চান।
অন্যদিকে নিয়োগকর্তাদের মধ্যেও কর্মীদের সুযোগ-সুবিধার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা রয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৮৫ শতাংশ নিয়োগকর্তা মনে করেন, কর্মীদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা একটি ইতিবাচক কর্মপরিবেশ ও প্রতিষ্ঠানের সুস্থ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সাহায্য করে। তবে গত ১২ মাসে অর্ধেকেরও কম প্রতিষ্ঠান এসব সুযোগ-সুবিধায় ব্যয় বাড়িয়েছে। কর্মীদের মনোবল বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন, দক্ষ কর্মী আকৃষ্ট করা এবং তাঁদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করাকে বিনিয়োগের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন নিয়োগকর্তারা।
অবসরজীবনের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে জরিপে। বিশেষ করে ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী কর্মীদের মধ্যে অবসরকালীন সঞ্চয় পরিকল্পনা না থাকার প্রবণতা বেড়েছে। দেশীয় ও বহুজাতিক উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানে এ পরিস্থিতি দেখা গেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমান জীবনের ব্যয় সামলাতে গিয়ে অনেক কর্মী দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের বিষয়টি পিছিয়ে দিচ্ছেন। ফলে কর্মজীবন শেষে আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে তাঁদের অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
কর্মক্ষেত্রে বাড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার
জরিপে কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিদিনের কাজের অংশ হিসেবে প্রায় অর্ধেক কর্মী এখন এ প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। তাঁদের বেশির ভাগই মনে করেন, এটি কাজের গতি বাড়ানোর পাশাপাশি মানসিক চাপ কমাতেও সাহায্য করছে। তবে কর্মীদের মধ্যে এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উৎসাহ ও সহযোগিতা এখনো যথেষ্ট নয়।
জরিপে ৪৬ শতাংশ কর্মী জানিয়েছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ফলে কাজের অতিরিক্ত চাপ ও মানসিক অস্থিরতা কিছুটা কমেছে। অন্যদিকে ৪০ শতাংশ কর্মী মনে করেন, এ প্রযুক্তির কারণে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ও আগ্রহজনক কাজে বেশি সময় দিতে পারছেন। ফলে দৈনন্দিন কাজের পাশাপাশি সৃজনশীল ও অর্থবহ দায়িত্ব পালনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তবে কর্মীদের প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এখনো ঘাটতি রয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া নিয়োগকর্তাদের মাত্র ৫৮ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানে দৈনন্দিন কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হয় অথবা অনুমতি রয়েছে। অর্থাৎ অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো এই প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা বা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা তৈরি হয়নি।
সামগ্রিকভাবে গবেষণাটি বলছে, কর্মীদের কাছ থেকে ভালো কাজ পাওয়ার জন্য শুধু বেতন দেওয়া যথেষ্ট নয়। তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা, অবসরকালীন সঞ্চয়, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কর্মীদের ব্যক্তিগত জীবনের আর্থিক চাপ কমাতে প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর উদ্যোগ নিলে কর্মক্ষেত্রে সন্তুষ্টি ও উৎপাদনশীলতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে কর্মী ধরে রাখা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাঁদের আস্থা তৈরিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

