মোবাইল অপারেটরদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তরঙ্গ বরাদ্দের মেয়াদ ১৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ২০ বছর করার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। একই সঙ্গে তিনটি ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ডে তরঙ্গের দাম পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে, যার ফলে তরঙ্গ বিক্রি থেকে সরকারের গড় বার্ষিক আয় কমতে পারে। পাশাপাশি মোবাইল অপারেটরদের ১২ কিস্তিতে তরঙ্গের মূল্য পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। এসব প্রস্তাবের বিষয়ে মতামত চেয়ে গত ১ নভেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, তরঙ্গ বরাদ্দ থেকে সরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব পেয়ে থাকে। বিটিআরসি ২০ বছর মেয়াদে যে দামে তরঙ্গ বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে, তাতে সরকারের রাজস্ব আয় কমতে পারে। কেন কম রাজস্ব আদায়ের প্রস্তাব করা হয়েছে, তা পর্যালোচনা করে মন্ত্রণালয় মতামত দেবে। তিনি আরও জানান, এ ক্ষেত্রে সরকারের রাজস্ব আয়, মোবাইল সেবার মান ও গ্রাহকদের সেবার ব্যয়সহ সব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে।
এদিকে লাইসেন্সের মেয়াদের চেয়ে বেশি সময়ের জন্য তরঙ্গ বরাদ্দ, কিস্তির সংখ্যা বাড়ানো এবং বিভিন্ন ব্যান্ডের তরঙ্গের দাম নির্ধারণের যৌক্তিকতা জানতে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারীকে একাধিকবার ফোন করেছে টিবিএস। পরে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তাঁর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রস্তাব অনুযায়ী, গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের অনুকূলে মোট ৭৯ দশমিক ২ মেগাহার্জ তরঙ্গ নবায়ন করা হবে। এর মধ্যে গ্রামীণফোন পাবে ৩২ দশমিক ৪ মেগাহার্জ, রবি ২২ দশমিক ৪ মেগাহার্জ এবং বাংলালিংক ২৪ দশমিক ৪ মেগাহার্জ। অপারেটর তিনটির বর্তমান লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হবে ২০৩৯ সালের ১০ মার্চ।
বিভাগের চিঠিতে বলা হয়েছে, তরঙ্গ নবায়ন ও বরাদ্দের ক্ষেত্রে ৯০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডের প্রতি মেগাহার্জ তরঙ্গের দাম ৩১৬ কোটি টাকা, ১৮০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডের ২৬৪ কোটি টাকা এবং ২১০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডের ২২৯ কোটি টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত এসব দামের সঙ্গে আয়কর ও ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত নয়। বর্তমানে ৯০০ ও ১৮০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডের প্রতি মেগাহার্জ তরঙ্গের দাম ২৬৩ কোটি টাকা এবং ২১০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডের দাম ২৪৫ দশমিক ৯ কোটি টাকা।
বিটিআরসির কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হলে অপারেটরগুলো তা নবায়ন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে লাইসেন্সের মেয়াদের চেয়ে বেশি সময়ের জন্য তরঙ্গ বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি আরও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অপারেটরদের আর্থিক চাপ কমাতে তরঙ্গের মূল্য পরিশোধের কিস্তির সংখ্যা বাড়ানোরও প্রস্তাব করা হয়েছে। আগে বিভিন্ন সময়ে তরঙ্গ বরাদ্দের মূল্য সর্বোচ্চ ১০ কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হলেও এবার ২০ বছর মেয়াদের বিপরীতে ১২টি সমান কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুযোগ রাখার প্রস্তাব করেছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ।
প্রস্তাব অনুযায়ী, তরঙ্গ নবায়নের নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে প্রথম কিস্তি এবং পরবর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে দ্বিতীয় কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। বাকি ১০টি কিস্তি প্রতিবছর পরিশোধ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে কোনো কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে বিলম্বিত সময়ের জন্য বার্ষিক ১৫ শতাংশ হারে বিলম্ব ফি দিতে হবে।
চিঠিতে বিটিআরসির বক্তব্য উদ্ধৃত করে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ বলেছে, অপারেটরদের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা, বেশি পরিমাণে তরঙ্গ বরাদ্দ নিতে উৎসাহিত করা এবং তরঙ্গ বরাদ্দের রোডম্যাপ বাস্তবায়ন সহজ করতে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে সরকারের পূর্বানুমোদন নিয়ে সর্বোচ্চ ১০ কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় নতুন বরাদ্দের ক্ষেত্রেও কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে মেয়াদ ১৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ২০ বছর করায় বর্ধিত মেয়াদের মূল্য পরিশোধে অপারেটরদের নগদ অর্থের ওপর এককালীন চাপ কমাতে ১০টির পরিবর্তে ১২টি সমান কিস্তি নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার তরঙ্গের মূল্য নির্ধারণে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তরঙ্গ নবায়নের সঙ্গে আর্থিক ও কারিগরি বিষয় জড়িত থাকায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যক্রম সম্পন্ন করতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, অর্থ বিভাগ এবং বিটিআরসির প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি ত্রিপক্ষীয় সভা আয়োজনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
মোবাইল নেটওয়ার্ক পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি হলো তরঙ্গ বা স্পেকট্রাম। অদৃশ্য রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির মাধ্যমে মোবাইল টাওয়ার থেকে গ্রাহকের ফোনে ভয়েস কল, ইন্টারনেট ডেটা ও বার্তা আদান-প্রদান হয়। এই তরঙ্গের মালিক রাষ্ট্র, আর সরকারের পক্ষে এর ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ করে বিটিআরসি। নির্দিষ্ট ফি দিয়ে বিটিআরসির কাছ থেকে তরঙ্গ বরাদ্দ নিয়ে গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের মতো অপারেটরগুলো সারা দেশে মোবাইল টাওয়ার ও নেটওয়ার্ক সরঞ্জামের মাধ্যমে টুজি, থ্রিজি, ফোরজি ও ফাইভজি সেবা দিয়ে থাকে। অপারেটরদের হাতে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত তরঙ্গ থাকলে নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়ে, এতে গ্রাহকদের ইন্টারনেটের গতি বাড়ার পাশাপাশি কলড্রপ কমে।

