মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ঢাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বব্যাংক ‘দক্ষিণ এশিয়ায় জনমিতিক পরিবর্তন: উন্নয়নের সহায়ক শক্তি থেকে প্রতিবন্ধকতার পথে’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন দেশে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক জরিপের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ২০২২ সালের জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরির ধীরগতির কারণে বাংলাদেশ তার ক্রমবর্ধমান কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না।
ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানে কমছে চাকরি
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ছোট আকারের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে গড়ে কর্মীর সংখ্যা কমেছে। মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানগুলোতেও কর্মসংস্থান হ্রাস পেয়েছে।
অর্থাৎ, দেশের ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পর্যাপ্ত নতুন চাকরি তৈরি করতে পারছে না।
এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে কর্মবাজারে প্রবেশ করা তরুণদের জন্য উপযুক্ত চাকরি পাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষাজীবন শেষ করে আনুষ্ঠানিক খাতে কাজ করতে আগ্রহী তরুণদের বড় অংশ বিকল্প জীবিকার দিকে ঝুঁকতে পারেন।
অনানুষ্ঠানিক খাতে ৫ কোটি ৮০ লাখ কর্মী
বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ অনানুষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত। এটি মোট কর্মরত মানুষের ৮৪ শতাংশ।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের স্নাতক ডিগ্রিধারী কর্মীদের ৪৪ শতাংশও অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন।
অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে সাধারণত নিয়মিত বেতন, চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং অবসরকালীন সুবিধা সীমিত থাকতে পারে। ফলে বড় একটি জনগোষ্ঠী কর্মরত থাকলেও তাঁদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত হয় না।
বিশ্বব্যাংকের এই তথ্য দেখায়, শুধু চাকরির সংখ্যা বাড়ানো নয়, মানসম্মত ও নিরাপদ কর্মসংস্থান তৈরি করাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
২০৪৫ সালে সর্বোচ্চ হবে কর্মক্ষম জনসংখ্যা
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত ২০৪৫ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে।
দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাব্য সময়ের তুলনায় এটি ১১ বছর পর।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের সামনে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সুবিধা কাজে লাগানোর জন্য এখনো কিছু সময় রয়েছে। তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে পর্যাপ্ত উৎপাদনশীল চাকরি তৈরি করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি থাকা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য সম্ভাবনা তৈরি করে। কিন্তু তাঁদের জন্য দক্ষতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ না থাকলে সেই সম্ভাবনার পুরো সুফল পাওয়া যায় না।
২০৫১ সালেই প্রবীণ জনগোষ্ঠীর দেশ হওয়ার পথে বাংলাদেশ
বাংলাদেশের জনমিতিক পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫১ সালে দেশের মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশ হবে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষ।
এই হারকে প্রবীণপ্রধান সমাজে উত্তরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
অর্থাৎ, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর মাত্র ছয় বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর দেশ হিসেবে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে পারে।
এতে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, অবসরকালীন আয় এবং প্রবীণদের দেখভালের জন্য সরকারি ব্যয়ের প্রয়োজন বাড়তে পারে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উন্নতি হলে বাড়তে পারে মাথাপিছু আয়
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শিক্ষা, শিশুপুষ্টি ও প্রাপ্তবয়স্কদের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের পাশাপাশি নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জিত হলে ২০৫০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন বর্তমান প্রবণতা অনুযায়ী প্রত্যাশিত অবস্থার তুলনায় সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ বেশি হতে পারে।
অন্যদিকে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় আরও বিস্তৃত সংস্কার এবং নারী-পুরুষের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের ব্যবধান কমানোর উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলে মাথাপিছু জিডিপি প্রত্যাশিত অবস্থার তুলনায় সর্বোচ্চ ১৩ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এই হিসাব সম্ভাব্য সংস্কারের ভিত্তিতে তৈরি পূর্বাভাস। নির্ধারিত পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মান ও কার্যকারিতার ওপর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে।
নারীদের কর্মসংস্থানের বাধা দূর করার তাগিদ
বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেন, বাংলাদেশের সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও ভালো মানের চাকরি তৈরির উপযোগী পরিবেশ দেওয়া।
একই সঙ্গে তরুণদের এমন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে, যা নিয়োগদাতাদের প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি নারীদের বেতনভিত্তিক কর্মসংস্থানে প্রবেশের বাধাগুলো দূর করার ওপরও গুরুত্ব দেন।
বিশ্বব্যাংকের মতে, নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে দেশের উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য বাড়তি রাজস্ব প্রয়োজন
জ্যঁ পেসমে আরও বলেন, আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশের জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক কাঠামো পরিবর্তিত হবে। প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা ও আয়সহায়তার প্রয়োজনও বাড়বে।
এসব ব্যয় মেটাতে সরকারকে রাজস্ব সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সুবিধা কাজে লাগানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক প্রস্তুতিও এখন থেকেই নিতে হবে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টিই বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য আগামী দুই দশক একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত বাড়লেও আনুষ্ঠানিক খাতে নতুন চাকরি তৈরির গতি দুর্বল থাকলে জনমিতিক সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে আসা পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা, ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণে সহায়তা দেওয়া, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা বাড়ানো এবং নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।
পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ২০৪৫ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পূর্বাভাস থাকলেও তার মাত্র ছয় বছর পর প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অনুপাত ১৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ফলে বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, জনমিতিক পরিবর্তনের এই সময়সীমার মধ্যেই পর্যাপ্ত ও মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব হবে কি না।

