ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি দ্বিতীয় একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে প্যাসেঞ্জার গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে সরকারের। এই দায়িত্ব পেতে অন্তত চারটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখিয়েছে। তাদের মধ্যে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মেনজিস এভিয়েশন আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে। নির্বাচিত হলে প্রথম বছরেই ১ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগের কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মেনজিসের প্রস্তাবিত এই অর্থ ব্যয় হবে গ্রাউন্ড সাপোর্ট সরঞ্জাম কেনা, আধুনিক বিমান চলাচল প্রযুক্তি সংযোজন, জনবল উন্নয়ন এবং পরিচালন সক্ষমতা বাড়ানোর কাজে। প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, দায়িত্ব পেলে প্রথম বছরেই সরাসরি এক হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এসব কর্মীর ৯৯ শতাংশই বাংলাদেশি হবেন। পরোক্ষভাবে আরও প্রায় সাড়ে চার হাজার মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বিমানবন্দর এলাকায় একটি প্রশিক্ষণ একাডেমি গড়ে তোলার পরিকল্পনাও জানিয়েছে মেনজিস। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ও বিমান চলাচলবিষয়ক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করতে চায় তারা। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, ঢাকার একাডেমিতে প্রশিক্ষণ শেষে কর্মীরা মেনজিসের আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কাজের যোগ্যতা পাবেন। ফলে প্রতিষ্ঠানটির বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের যেকোনো বিমানবন্দরে কাজ করার সুযোগ পাবেন বাংলাদেশি কর্মীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেনজিস এভিয়েশন বিশ্বের অন্তত ৬৫টি দেশের প্রায় ৩৫০টি বিমানবন্দরে কার্যক্রম চালায়। প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় ১৬ লাখ উড়োজাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড এবং ২৪ লাখ টন কার্গো সামলায়।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্র জানায়, আগামী ১৬ ডিসেম্বর বহুল প্রতীক্ষিত তৃতীয় টার্মিনাল চালুর পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। দেশীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এই টার্মিনালেও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব পালন করবে। তবে সেবার আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে আরও একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে প্যাসেঞ্জার গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে যুক্ত করা হবে।
বেবিচকের এক কর্মকর্তা জানান, মেনজিস ছাড়াও সুইজারল্যান্ডের সুইসপোর্ট, তুরস্কের চেলেবি এভিয়েশন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডানাটা এই দায়িত্ব পেতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তৃতীয় টার্মিনাল অত্যাধুনিক হলেও শুধু আধুনিক অবকাঠামো দিয়ে আঞ্চলিক বিমান চলাচল কেন্দ্র হওয়া যায় না। এর সাফল্য নির্ভর করবে পরিচালন দক্ষতা, নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবার মানের ওপর। ইমিগ্রেশনে কত সময় লাগছে এবং লাগেজ পেতে কত দেরি হচ্ছে, তা দিয়েই যাত্রীরা বিমানবন্দরের সেবা মাপেন। আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনগুলোর কাছেও নিরাপদ উড়োজাহাজ পরিচালনা, দ্রুত টার্নঅ্যারাউন্ড ও নির্ভরযোগ্য গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিকল্প নেই বলে মনে করেন তাঁরা।
গত ৫০ বছর ধরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স দেশের বিমানবন্দরগুলোতে এ সেবা দিয়ে আসছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এর পাশে আন্তর্জাতিক মানের নতুন প্রতিষ্ঠান যুক্ত হলে প্রতিযোগিতা বাড়বে। একই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক সরঞ্জাম ও দক্ষ জনবল আসার সুযোগ তৈরি হবে।
একটি বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠান সাধারণত যাত্রীদের লাগেজ ওঠানো-নামানো, উড়োজাহাজের সেবা, এপ্রোন পরিচালনা এবং পরবর্তী ফ্লাইটের প্রস্তুতির কাজ দেখে। এসব কাজে বিলম্ব বা ত্রুটি সরাসরি যাত্রীসেবা ও ফ্লাইটের সময়সূচিতে প্রভাব ফেলে। তাই প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের সময় শুধু বিনিয়োগ বা বাণিজ্যিক প্রস্তাব নয়, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও পরিচালন সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মফিদুর রহমান বলেন, তৃতীয় টার্মিনালের আধুনিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালাতে অভিজ্ঞ জনবল প্রয়োজন। আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের সেবা দেওয়ার সক্ষমতাও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের থাকতে হবে।
মেনজিস এভিয়েশনের অপারেশনস বিভাগের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট জন হেন্ডারসন বলেন, বিশ্বের শীর্ষ বিমান সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান হওয়া কাকতালীয় নয়। বাজারে নেতৃত্ব দিতে পারে এমন প্রশিক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করেই তাঁরা এ অবস্থানে এসেছেন। নিরাপদ ও মানসম্মত পরিচালনার কারণেই বিমানবন্দর ও এয়ারলাইনগুলো বারবার মেনজিসকে বেছে নেয় বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব রিয়েল-টাইম তথ্য সংগ্রহ ও কাজ বণ্টনের ব্যবস্থা আছে। এর মাধ্যমে সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জাম নিশ্চিত করা যায়। ফলে এয়ারলাইন ও বিমানবন্দরের জন্য নিরাপদ ও দক্ষ পরিচালনা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে তাৎক্ষণিক পরিচালনগত তথ্যও দেওয়া যায়।
লাগেজ ব্যবস্থাপনা তৃতীয় টার্মিনালের জন্য অন্যতম বড় পরীক্ষা হবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার আগে যাত্রীরা কত দ্রুত লাগেজ পাচ্ছেন, তার ওপর সেবার মান অনেকটা নির্ভর করবে। টার্নঅ্যারাউন্ডেও সময় গুরুত্বপূর্ণ। লাগেজ নামানো, উড়োজাহাজে সেবা দেওয়া, পরবর্তী ফ্লাইটের জন্য লাগেজ তোলা কিংবা এপ্রোনে সমন্বয়ের কোনো ধাপে দেরি হলে তার প্রভাব পড়ে ফ্লাইটের সময়সূচিতে।
মেনজিসের কর্মকর্তারা বলছেন, রিয়েল-টাইম ব্যাগেজ স্ক্যানিং ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে বেবিচকের নির্ধারিত মান পূরণের সক্ষমতা তাঁদের আছে। ওয়াইডবডি উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে প্রথম লাগেজ ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে এবং শেষ লাগেজ ৪০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছে তারা। কর্মী নিয়োগের তিন মাসের মধ্যে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব বলেও তাঁরা মনে করেন।
তবে বিনিয়োগের প্রস্তাব আকর্ষণীয় হলেও প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ে আরও কিছু বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। চুক্তির মেয়াদ শেষে বাংলাদেশ নিজে কী ধরনের সক্ষমতা অর্জন করবে, সেটি তাদের অন্যতম। প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দেশীয় জনবলের দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়টি স্পষ্ট না হলে দীর্ঘমেয়াদে সুফল নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। এখন দেখার বিষয়, ১৬ ডিসেম্বরের আগে সরকার কোন প্রতিষ্ঠানকে বেছে নেয়।

