সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকার সড়ক নেটওয়ার্ক উন্নয়ন ও সংযোগ জোরদারের লক্ষ্যে নেওয়া ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-৩’-এর কাজের পরিধি ও মেয়াদ আরেক দফা বাড়ানো হচ্ছে। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নের এই প্রকল্প ২০২০ সালের জুলাইয়ে চার বছর মেয়াদে শুরু হয়েছিল। তিন দফা সংশোধনের পর এখন এর মেয়াদ ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত, অর্থাৎ মোট নয় বছর করার প্রস্তাব এসেছে।
একই সঙ্গে ব্যয় প্রায় ৩ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা বাড়িয়ে ১০ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকার কাছাকাছি নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশোধনী প্রস্তাবটি আজ বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য তোলা হবে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের ষষ্ঠ একনেক সভা আজ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত হবে। সভায় সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমান। গত ২৫ অক্টোবর সভাটি হওয়ার কথা থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের কারণে তা স্থগিত করা হয়েছিল।
একনেকের নোটিশ অনুযায়ী, আজ প্রায় ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ের ১৪টি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। এর মধ্যে ১২টি নতুন এবং দুটি সংশোধিত প্রকল্প। এসব প্রকল্পে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ১১ হাজার ৮৯৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, প্রকল্প ঋণ ৩১৬ কোটি টাকা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ২৮৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তালিকার বাইরে সরাসরি টেবিলে আরও দুটি প্রকল্প তোলা হবে। দুটিই স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকল্প, যাতে মোট খরচ হবে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা।
পল্লি অবকাঠামো প্রকল্পটি ২০২০ সালের জুনে অনুমোদনের সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬ হাজার ৪৭৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। বাস্তবায়নের সময়সীমা ছিল ওই বছরের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। প্রথম সংশোধনে ব্যয় সামান্য বাড়িয়ে করা হয় ৬ হাজার ৫২৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা এবং মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। দ্বিতীয় সংশোধনে ব্যয় অপরিবর্তিত রেখে মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন করা হয়।
চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত ভৌত অগ্রগতি ৯৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৯৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অর্থাৎ নির্ধারিত ব্যয় ও মেয়াদ প্রায় শেষ হওয়ার মুখে। এ অবস্থায় তৃতীয় সংশোধনীর প্রস্তাব এসেছে। এতে ব্যয় বাড়বে ৩ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা, আর মেয়াদ বাড়বে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে, সারা দেশের গ্রামীণ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক উন্নত করে কৃষি ও অকৃষি পণ্যের উৎপাদন ব্যয় কমানো, বাজারজাত সহজ করা এবং পল্লি অঞ্চলের মাথাপিছু আয় বাড়ানো। প্রত্যন্ত গ্রামকে নিকটবর্তী গ্রোথ সেন্টার, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও উপজেলা-জেলা সদরের সঙ্গে যুক্ত করা এবং স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান তৈরির কথাও বলা হয়েছে।
প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব থাকলেও নতুন করে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, মূল প্রকল্প নেওয়ার আগে এলজিইডির তিন কর্মকর্তার একটি কারিগরি কমিটি সম্ভাব্যতা যাচাই করেছিল। বড় অঙ্কের ব্যয়বৃদ্ধি ও দীর্ঘ মেয়াদ বাড়ানোর পরও নতুন যাচাই না হওয়ায় প্রকল্পের ব্যয়ের যৌক্তিকতা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
এলজিইডির আরেকটি প্রকল্প সরাসরি একনেকে তোলা হবে। স্থানীয় সরকার বিভাগের ‘সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (এসআইডিপি)’ নামের এই নতুন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫৬৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। ধর্মীয় সম্প্রীতি উন্নয়নের উদ্দেশ্যে নেওয়া এ প্রকল্পে দেশের ৫৩ হাজার মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা, গুরুদুয়ারা, ঈদগাহ, কবরস্থান ও শ্মশানের মতো ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো সংস্কার এবং নিরাপত্তাবেষ্টনী নির্মাণের লক্ষ্য রয়েছে।
আজকের সভায় আরও যেসব প্রকল্প উঠছে, তার মধ্যে রয়েছে পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষায়িত ও অপারেশনাল যানবাহন কেনা, তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩ নামে দুটি কূপ খনন, নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, বরেন্দ্র অঞ্চলে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সড়ক, নর্দমা ও ফুটপাত উন্নয়ন। এ ছাড়া রয়েছে ক্লাইমেট স্মার্ট নগর উন্নয়ন প্রকল্প, পাঁচটি মেডিকেল কলেজে নিউক্লিয়ার মেডিসিন সেন্টার স্থাপন, বরিশাল সিটি করপোরেশনের খাল পুনরুদ্ধার ও পাড় সংরক্ষণ এবং নির্বাচিত পৌরসভায় স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রকল্প।
আবাসন ও নাগরিক সেবা খাতেও প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে আছে ঢাকা সেনানিবাসের মইনুল রোড আবাসিক এলাকায় কর্মকর্তাদের বাসস্থান নির্মাণ, গাবতলা কলোনিতে সরকারি কর্মচারীদের জন্য বহুতল ভবন, মেট্রো ঢাকার পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন এবং গ্রামীণ সড়কে ১৫ মিটার পর্যন্ত দৈর্ঘ্যের সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ।
এ ছাড়া অবগতির জন্য আরও চারটি প্রকল্প সভায় উপস্থাপন করা হবে। প্রতিটির ব্যয় ৫০ কোটি টাকার কম হওয়ায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগেই এগুলো অনুমোদন করেছেন। প্রকল্পগুলো হলো দিনাজপুর জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের হৃদরোগ চিকিৎসাসেবার আধুনিকীকরণ, শিশু-কিশোর ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ট্রাফিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ।
সব মিলিয়ে আজকের একনেক সভায় বড় আলোচনার বিষয় হতে পারে পল্লি অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদবৃদ্ধি। অনুমোদন পেলে প্রকল্পটি মূল পরিকল্পনার দ্বিগুণের বেশি সময় ধরে চলবে। ফলে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারার প্রবণতা এবং সরকারি অর্থ ব্যবহারের জবাবদিহি নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা আরও জোরালো হতে পারে।

